শৃঙ্খলের অন্তরালে মহাশক্তি: প্রেসিডেন্সি জেলে নেতাজির দুর্গোৎসব ও এক অনবদ্য অগ্নিসংগ্রাম

লেখক : সৈকত প্রসাদ রায়

পরাধীন ভারতের অন্ধকার কারাকক্ষ তখন শৃঙ্খলের শব্দে ভারী। চতুর্দিকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কঠোর নজরদারি, লোহার গরাদ, আর পাহারাদারের রুক্ষ দৃষ্টি। ইট-কাঠের সেই নিষ্ঠুর দেওয়ালের ভিতরে মানুষের স্বপ্ন, ইচ্ছা, এমনকি নিঃশ্বাস পর্যন্ত যেন নিয়ন্ত্রিত হত ব্রিটিশ শাসকের ইচ্ছায়। কিন্তু সেই অন্ধকার কক্ষের ভিতরেও জ্বলছিল এক অবিনাশী শিখা – স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের শিখা, যাকে কোন লৌহকপাট নিভিয়ে দিতে পারেনি। ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাস। কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি ভারতের অগ্নিপুরুষ, দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসু। কিন্তু লৌহকপাট আর পাহারাদারের চোখ রাঙানি কি কখনও আত্মাকে বন্দি করতে পারে? পারেনি বলেই, জেলের সেই নিশ্ছিদ্র প্রাচীরের মাঝেই রচিত হয়েছিল ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব অধ্যায় – কারাগারের অন্তরালে দুর্গোৎসবের সূচনা। সেই ঘটনা আজও বাঙালির মনে এক অনির্বচনীয় শ্রদ্ধা আর গর্বের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, কারণ তা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের গল্প নয় তা এক জাতির আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের কাহিনী।

সুভাষচন্দ্র বসুর কাছে দেবী দুর্গা কেবল সনাতন ধর্মীয় আচার কিংবা আড়ম্বরের প্রতিমা ছিলেন না, তিনি ছিলেন ‘মহাশক্তি’ – অধর্ম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর পরম প্রেরণা। নেতাজির চিন্তাচেতনায় দুর্গা মানে কেবল দশভুজা এক দেবী নন, তিনি এক প্রতীক – নারীশক্তির প্রতীক, প্রতিরোধের প্রতীক, আর সর্বোপরি পরাধীন ভারতমাতার মুক্তিকামনার প্রতীক। শক্তি আরাধনার এই ভাবনা তাঁর মধ্যে গড়ে উঠেছিল ছোটবেলা থেকেই, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের আদর্শে লালিত হয়ে। বিবেকানন্দ যেমন বলতেন, দুর্বলতা পাপ, শক্তিই জীবনের মূল কথা – সেই দর্শনকেই নেতাজি রাজনৈতিক সংগ্রামের ভাষায় রূপান্তরিত করেছিলেন। তাঁর কাছে দুর্গাপুজো ছিল আসলে জাতির অন্তরে ঘুমিয়ে থাকা শক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক উপায়।

১৯৪০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্সি জেলের বন্দিশালায় নেতাজির উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় দুর্গাপুজো। এই উদ্যোগ নেওয়া সহজ কাজ ছিল না। জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি আদায় করা, প্রতিমা তৈরির ব্যবস্থা করা, পূজার উপকরণ সংগ্রহ করা, এবং সর্বোপরি সহ-বন্দিদের মধ্যে সেই উৎসাহ সঞ্চার করা – প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন ছিল অসীম ধৈর্য আর দৃঢ় সংকল্পের। বিপ্লবী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী তাঁর ঐতিহাসিক স্মৃতিকথা ‘নেতাজি সঙ্গ ও প্রসঙ্গ’ (দ্বিতীয় খণ্ড)-এ উল্লেখ করেছেন, সুভাষচন্দ্র কীভাবে সহ-বন্দিদের একসূত্রে গেঁথে জেলের চার দেয়ালের মাঝে এই পুজোর আয়োজন করেছিলেন। নরেন্দ্রনারায়ণের বর্ণনায় এটি ছিল এক পরম ‘সন্ধিপূজা’ – যেখানে ধর্মীয় ভক্তি আর দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার সংকল্প মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। এই সন্ধিক্ষণ শব্দটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল এক গভীর তাৎপর্য – অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে যেমন দেবী দুর্গা চণ্ড-মুণ্ড বধ করে চামুণ্ডা রূপ ধারণ করেন, তেমনই বন্দি বিপ্লবীদের মনেও যেন সেই সন্ধিক্ষণেই জন্ম নিচ্ছিল প্রতিরোধের নতুন শক্তি।

জেলের ভিতরে পুজোর আয়োজন মানেই ছিল সীমাবদ্ধ সম্পদের মধ্যে অসীম ভক্তি আর সৃজনশীলতার মেলবন্ধন। প্রতিমা তৈরির উপকরণ থেকে শুরু করে পুজোর নৈবেদ্য, সবকিছুই জোগাড় করতে হত জেল কর্তৃপক্ষের কড়া নজরদারির মধ্যে দিয়ে। কিন্তু নেতাজির নেতৃত্বে বন্দিরা এই প্রতিকূলতাকেও জয় করেছিলেন। তাঁদের কাছে এই পুজো ছিল কেবল দেবী আরাধনা নয়, বরং এক প্রকার নীরব প্রতিবাদ – ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে এই বার্তা যে, তারা শরীরকে বন্দি করতে পারলেও মনের স্বাধীনতাকে কখনও দমন করতে পারবে না।

প্রেসিডেন্সি জেলে ১৯৪০ সালের এই পুজো কিন্তু আকস্মিক কোন ঘটনা ছিল না। এর সূচনার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল এরও প্রায় দেড় দশক আগে – ১৯২৫ সালে, দূর বার্মার (অধুনা মায়ানমার) মান্দালয় জেলে। ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখলে বোঝা যায়, নেতাজির জীবনে কারাবাস কোন নতুন ঘটনা ছিল না, বরং তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে বিভিন্ন কারাগারের অন্ধকারে। কিন্তু প্রতিটি কারাবাসকেই তিনি রূপান্তরিত করেছিলেন সংগ্রামের নতুন মঞ্চে।

মান্দালয় জেলে বন্দি থাকাকালীন সুভাষচন্দ্র ও তাঁর সহবন্দি বিপ্লবীরা দুর্গাপুজোর অধিকার দাবি করেছিলেন। তৎকালীন ব্রিটিশ জেলের নিয়মানুসারে খ্রিস্টান বন্দিরা ধর্মীয় পালনের সমস্ত সুযোগ ও সরকারি অনুদান পেত, অথচ ভারতীয় রাজনৈতিক বন্দিদের নিজ ধর্ম পালনে বাধা দেওয়া হত। এই বৈষম্য নেতাজিকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তাঁর কাছে এটি কেবল ধর্মাচরণের প্রশ্ন ছিল না, বরং ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তর্নিহিত বৈষম্যমূলক চরিত্র উন্মোচনের একটি সুযোগও ছিল। নেতাজি এই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন এবং দীর্ঘ অনশন পালন করে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দুর্গোৎসবের অধিকার ছিনিয়ে নেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে দেয় যে, ধর্মীয় অধিকারের লড়াই আর রাজনৈতিক স্বাধীনতার লড়াই তাঁর কাছে ছিল একই সংগ্রামের দু’টি মুখ। শরীরকে ক্ষয় করেও তিনি নীতির প্রশ্নে কখনও আপোষ করেননি – এই মানসিকতাই পরবর্তীকালে তাঁকে ভারতের অন্যতম শ্রদ্ধেয় নেতায় পরিণত করেছিল।

ত্রিশের দশকের শেষের দিকে সুভাষচন্দ্র যখন জাতীয় রাজনীতির উত্তাল শিখরে, কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে গান্ধীজির সঙ্গে নীতিগত মতপার্থক্যের মধ্যে দিয়ে নিজের পথ তৈরি করছেন, তখনও তিনি নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। সেই সময়েও তিনি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী পুজো – যেমন সিমলা ব্যায়াম সমিতি, বাগবাজার সার্বজনীন ও কুমোরটুলির দুর্গাপুজোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৩৮-৩৯ সালে তিনি বাগবাজার ও কুমোরটুলির সম্পাদক পদও সামলেছেন। এই কাজের মধ্যে দিয়ে বোঝা যায়, নেতাজির কাছে দুর্গাপুজো কখনওই নিছক পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠান ছিল না – এটি ছিল জনসংযোগের এক মাধ্যম, সাধারণ মানুষের সঙ্গে আত্মিক যোগসূত্র স্থাপনের এক পথ, এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রসারের এক কার্যকর হাতিয়ার। সার্বজনীন পুজোর মণ্ডপে হাজার হাজার মানুষের সমাগমকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন স্বদেশপ্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য, ঠিক যেভাবে পরবর্তীকালে তিনি ব্যবহার করেছিলেন রেডিও সম্প্রচার ও জনসভাকে।

ফলে, ১৯৪০ সালে হোলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের আন্দোলনের জেরে গ্রেফতার হয়ে প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি হওয়ার পর সেই চেতনাকেই পুনরায় রূপ দেন দেশনায়ক। মান্দালয়ের সেই অনশন-জয়ী অধিকার আর কলকাতার সার্বজনীন পুজোর সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা – এই দুইয়ের মিলনেই জন্ম নেয় প্রেসিডেন্সি জেলের ঐতিহাসিক দুর্গোৎসব। এটি নিছক পূর্ববর্তী ঘটনার পুনরাবৃত্তি ছিল না, বরং ছিল এক পরিণত রাজনৈতিক-আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির চূড়ান্ত প্রকাশ, যেখানে ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনীতি একসূত্রে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল।

প্রেসিডেন্সি জেলে নেতাজির এই পুজো কেবল ফুল-বেলপাতা আর ধূপ-দীপ জ্বেলে পুজো করা ছিল না, তা ছিল এক মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব। জেলের সংকীর্ণ পরিসরে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে বন্দিদের মনে জেগে থাকত অনিশ্চয়তা আর হতাশা, সেখানে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান কীভাবে গোটা পরিবেশকে বদলে দিতে পারে, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন নেতাজি। পুজোর দিনগুলোতে জেলের সেই রুক্ষ, নিষ্প্রাণ দেয়ালগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেত। ঢাকের আওয়াজ, মন্ত্রোচ্চারণ, আর বন্দিদের সম্মিলিত কণ্ঠের জয়ধ্বনি – এসব মিলিয়ে গড়ে উঠত এক অভাবনীয় পরিবেশ, যা সাধারণ কারাজীবনের একঘেয়েমি আর যন্ত্রণাকে সাময়িকভাবে হলেও ভুলিয়ে দিত।

পরাধীনতার শিকলে বাঁধা বন্দি বিপ্লবীরা যখন মা দুর্গার চরণে অঞ্জলি দিতেন, তখন সেই মৃন্ময়ী প্রতিমার মাঝে তাঁরা দেখতে পেতেন শৃঙ্খলিতা ‘ভারত মাতা’র রূপ। এই ভাবনা নতুন ছিল না – বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম্‌’ থেকে শুরু করে স্বদেশী আন্দোলনের কাল পর্যন্ত ভারতমাতাকে দুর্গার রূপে কল্পনা করার এক দীর্ঘ ঐতিহ্য বাংলার সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক জীবনে বহমান ছিল। নেতাজি সেই ঐতিহ্যকেই নতুন প্রাণ দিয়েছিলেন কারাগারের অন্তরে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অশুভ শক্তিকে বিনাশ করার মন্ত্র ধ্বনিত হত কারাকক্ষের প্রতিটি কোণে, আর সেই মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে দিয়ে বন্দিরা যেন নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করতেন – আসন্ন সংগ্রামের জন্য, আসন্ন মুক্তির জন্য।

ব্রিটিশ শাসক ভেবেছিল কারারুদ্ধ করে তারা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মনোবল ভেঙে দেবে। নির্জন কারাবাস, শারীরিক নির্যাতন, পরিবার-পরিজনের থেকে বিচ্ছিন্নতা – এসবের মধ্যে দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসকরা চেয়েছিল বিপ্লবীদের চেতনাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে। কিন্তু নেতাজি সেই কারাপ্রাঙ্গণকেই বদলে দিয়েছিলেন এক আত্মজাগরণের বেদীতে। কারাগারের অন্ধকার দূর করে সেখানে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী চেতনার আলো। এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, প্রকৃত নেতৃত্ব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে বা রাজনৈতিক মঞ্চে নয়, বরং সবচেয়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতিতেও সহযোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখার ক্ষমতার মধ্যেই নিহিত। জেলের প্রতিটি বন্দি সেই পুজোর দিনগুলোতে অনুভব করেছিলেন যে তাঁরা একা নন – তাঁদের পাশে আছেন এক নেতা, যিনি প্রতিকূলতার মধ্যেও আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে জানেন।

এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হ’ল, এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ দৃঢ় প্রতিবাদ। জেল কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চেয়ে, নিয়মের মধ্যে থেকেই নেতাজি এমন এক ঘটনা ঘটিয়েছিলেন, যা ব্রিটিশ শাসনের অন্যায় নীতির বিরুদ্ধে এক জোরালো বার্তা বহন করেছিল। এভাবেই সত্যাগ্রহ আর আইন অমান্যের বাইরেও প্রতিরোধের এক নতুন ভাষা তিনি আবিষ্কার করেছিলেন – সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ভাষা, যেখানে অস্ত্র নয়, বরং আচার-অনুষ্ঠান আর সম্মিলিত ভক্তিই হয়ে উঠেছিল সংগ্রামের হাতিয়ার।

এই ঘটনাটিকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে ১৯৪০ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকেও একবার ফিরে তাকানো প্রয়োজন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন সবে শুরু হয়েছে, আর ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে কোনরকম আলোচনা ছাড়াই ভারতকে যুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সারা দেশে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। সুভাষচন্দ্র বসু তখন কংগ্রেসের মধ্যে থেকেও এক স্বতন্ত্র পথের কথা ভাবছিলেন – আরও তীব্র, আরও প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পথ। হোলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের আন্দোলন ছিল তারই একটি প্রকাশ, যার জেরে তাঁকে গ্রেফতার করে প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি করা হয়। এই বন্দিদশাতেই, নিজের স্বাস্থ্যের চরম অবনতির মধ্যেও, তিনি অনশন শুরু করেছিলেন – আর সেই একই সময়ের আশেপাশেই ঘটেছিল এই দুর্গোৎসবের আয়োজন। এই সমাপতন থেকেই বোঝা যায়, নেতাজির কাছে শারীরিক সংগ্রাম আর আধ্যাত্মিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রাম কখনও পরস্পরবিরোধী ছিল না, বরং একে অপরের পরিপূরক ছিল।

আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কলকাতার প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে সেই দুর্গোৎসব নিয়ম মেনে উদযাপিত হয়। কালের নিয়ম বদলেছে, রাজবন্দিদের জায়গায় আজ অন্য বন্দিরা রয়েছেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে, শাসনব্যবস্থা বদলেছে – কিন্তু ইতিহাসের সেই দীর্ঘশ্বাস আর গৌরবময় চেতনা আজও জেলের বাতাসে ভেসে বেড়ায়। প্রতি বছর যখন সেই কারাপ্রাঙ্গণে ঢাকের আওয়াজ ওঠে, তখন যেন সময়ের ব্যবধান ঘুচে যায়, আর ১৯৪০ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি পুনরায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই ধারাবাহিকতা নিজেই এক বিস্ময়কর ইতিহাস – একটি ঘটনা কীভাবে প্রায় নয় দশক ধরে একটি প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যে পরিণত হতে পারে, তার জীবন্ত দৃষ্টান্ত।

নেতাজির সূচিত সেই দুর্গোৎসব প্রমাণ করে দেয় – দেহকে বন্দি করা যায়, কিন্তু দেশের জন্য উৎসর্গীকৃত চেতনাকে কোন শৃঙ্খল দিয়েই বাঁধা রাখা যায় না। পরাধীনতার অন্ধকারের বুক চিরে মা দুর্গার যে মহামন্ত্র সেদিন সুভাষচন্দ্র বসু উচ্চারণ করেছিলেন, তা আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এক অমর দেশপ্রেমের অগ্নিশিখা হয়ে জ্বলে। এই ঘটনা আমাদের শেখায়, প্রকৃত স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক নয়, তা মানসিক ও আত্মিকও বটে। আর সেই আত্মিক স্বাধীনতার বীজ যিনি একবার নিজের হৃদয়ে বপন করতে পারেন, তাঁকে দমন করার সাধ্য কোন শাসকের নেই – তা সে যতই শক্তিশালী হোক না কেন।

আজকের প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস কেবল অতীতের এক গৌরবগাথা নয়, বরং এক জীবন্ত প্রেরণা। যখন আমরা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হই, যখন মনে হয় পরিস্থিতি আমাদের সম্পূর্ণভাবে বেঁধে ফেলেছে, তখন নেতাজির এই দুর্গোৎসবের কাহিনী আমাদের মনে করিয়ে দেয় সংকল্প আর বিশ্বাসের শক্তি দিয়ে সবচেয়ে কঠিন প্রাচীরও ভেঙে ফেলা সম্ভব। প্রেসিডেন্সি জেলের সেই ছোট্ট মণ্ডপ, সেই সীমিত উপকরণের পুজো, আজ ইতিহাসের পাতায় হয়ে উঠেছে এক বিশাল প্রতীক, মানবাত্মার অদম্য জয়যাত্রার প্রতীক, যা প্রতিটি প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয় যে শৃঙ্খলের অন্তরালেও মহাশক্তি জেগে থাকতে পারে, আর সেই শক্তিই একদিন ভেঙে দেয় পরাধীনতার সমস্ত বন্ধন।


তথ্যসূত্র –

১) নেতাজি সঙ্গ ও প্রসঙ্গ ( দ্বিতীয় খণ্ড ) – নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী

২) নেতাজি ও সেকালের দুর্গাপূজা – সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত

৩) আমি সুভাষ বলছি – শৈলেশ দে


লেখক পরিচিতি : সৈকত প্রসাদ রায়
সৈকত প্রসাদ রায় আধ্যাত্মিক ও সাহিত্যিক বিষয় নিয়ে লেখেন। তিনি সারদা মা-কে নিয়ে লিখেছেন বই “Teachings of The Holy Mother”, যেখানে সারদা মার জীবন, আদর্শ ও শিক্ষা নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি মাদার টেরেসা-কে নিয়ে লিখেছেন বই “The Universal Love of Mother Teresa”, যেখানে মানবতার প্রতি মাদার টেরেসার অমোঘ প্রেম এবং দয়ালু কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া তিনি বিভিন্ন জনপ্রিয় সাহিত্যিক গল্পগ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো “সাতরঙা প্রেম”, যা পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। লেখক সৈকত প্রসাদ রায় প্রতিলিপি, সববাংলা ব্লগ-সহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত লেখালেখি করেন। এছাড়া তাঁর লেখা আনন্দবাজার পত্রিকা, বর্তমান পত্রিকা এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up