লেখক : সুতপা সোঽহং
বিকেলে খিদেয় পেট চেপে বসেছিল মিখালি সোরেন।
গিরগিটিদের জিজ্ঞাসা, ‘ও প্রিয় ভাই কী করেন?’
তাদের চেনে না, জানে না, মিখালি হুড়মুড়িয়ে ওঠে;
সব সাদা পরা এক নেতা দেখে সে পিছনে হঠে।
‘ভয় নাই ভয় নাই, মাখু ভাই, কাছে তো আসেন!
এই যে আমাদের নেতা, যা খুশি চাইতে পারেন!
‘যা খুশি? আমার তো কিছুই নাই, সবই দরকার;
তবে পেট ভরে ভাত রোজ, চাই না কিছু আর।’
জোরে জাপটে ধরে নেতা বলে বুকেতে মিশিয়ে
‘সব পাবে আগে বলো, ভাত খাবে কী দিয়ে?
মাটন পাবে, চিকেন পাবে, একুশ সের কাতলা;
সাথে আলু ঝুরি ভাজা, আর ডাল পাতলা।
সোনাভাই, তবে একখান কথা মনে রেখো;
আমাকেই ভোট দিলে ভাত কেন বিরিয়ানি চেখো।
আর যদি জিতে যাই ঘর হবে পাকা;
রাস্তাও পিচঢালা, চলবে চার চাকা।
পেট পুরে খাবে দাবে;
কাজ-কাম মেলা পাবে।
পুজো, ঈদে প্যাণ্ট-জামা সে সব তো বাঁধা।
এরপরেও না জেতালে একেবারে গাধা!
ভোট শুধু আমাকেই, ভুলবে না যেন;
কল্লা ফেলতেও আমার কিন্তু জুরি নেই জেনো!’
বলেই অদৃশ্য হয় সেই গিরগিটির দল।
ভোট দিতে যায় মাখু হাঁটে টলমল!
দিন শেষে বাড়ি ফেরে বিরিয়ানি সাথে;
গিরগিটিকে ভোট দেওয়ার পুরস্কার হাতে।
একবেলা পেট পুরে খায় মাখু সোরেন
তাই ভোট বিক্রির দায়ে আজ ‘মিখালি মরেন’
বাকি দিন আধপেটা, খালিপেটে থাকা।
মুখে বলে মাখু ‘সুদিন ফিরবে কাকা!’
মাস শেষে ফল হয় জিতেছে গিরিগিটি।
চ্যালাদের নাচা গানা বাজে ডিজে মারে সিটি!
খিদায় কাতর মাখু চায় দু’মুঠো ভাত;
বদলে তার মুখে মদ ঢালে মাতালের জাত!
বমি করে মাখু যায় খোদ নেতার কাছে।
নেতা তখন ধরে আনা নারী থেকে কিশোরী বাছে!
সে কামে মত্ত, মদে চুর, টাকার শিকারী।
মাখুকে দেখে হাঁকে ‘এসময়ে কেন আসে সমস্ত ভিখারী?’
খিদায় ক্লান্ত মাখু সবিনয়ে বলে
‘আমি আপনার সোনা ভাই, ভুলে গেলে চলে?’
‘আমার ভাই তুই? হাসালি ছোঁড়া!
কে আছিস শিগগির এ ভিখারী সরা।’
ছুটে আসে দানব আর গুণ্ডা যত
মাখুকে লাথি মারে হাজার শত।
ব্যথায় ককিয়ে উঠেও ভাত চায় মাখু;
চ্যালারা শাসিয়ে ওঠে শান দেয় চাকু।
‘ভাঙব রে হাড়গোড় আবার আসিস যদি
বুঝবি কাকে নেতা বলে, কাকে বলে গদি!
ভাত খেতে চাস এত ভিক্ষাই কর না
নইলে খেটে খেলে নাড়া গতর খানা।
‘বেশ, ভাত চাই না, কাজ জুটিয়ে দেন।
তবে প্রশ্ন করি ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ক্যান্?’
‘নেতার কাছে প্রশ্ন করিস, লজ্জা করে না?’
গিরগিটিরা ধাক্কা দিয়ে ফেলে বলে ‘এখান থেকে যা।’
ভাত নাই, কাজ নাই, নাইকো পাম্প কল;
দাওয়ার পাশে চলে গেছে নোংরা ড্রেনের নল।
হাজার মাখুর ভারতবর্ষের জ্বলে না উনুন।
ড্রেনের জলে পেট ভরায় অল্প মিশিয়ে নুন!
লেখক পরিচিতি : সুতপা সোঽহং
সুতপা সোঽহং এর জন্ম ১৯৯২ সালের ১১ই মে। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার নয়াবাজার গ্রামে শৈশব ও কৈশোর কাটলেও বর্তমানে তিনি শিলিগুড়ি নিবাসী। সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত। বহুদিন ধরে বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিন, সংকলন ও বাণিজ্যিক পত্রিকায় কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, অণুগল্প, উপন্যাসিকা লিখে চলেছেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৫টি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'জলের কোলাজ' পেয়েছে সেরা বই ২০২৫ এর সম্মাননা। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'চন্দন চর্চিত' সম্মানিত হয়েছে কবি রমা প্রসাদ মিত্র স্মৃতি কাব্যগ্রন্থ পুরস্কার, রেনেসাঁস সাহিত্য সম্মান, দিশারী সাহিত্য পুরস্কারের দ্বারা। এছাড়াও কালীপদ পান্ডে স্মৃতি পুরস্কার, অরুপ রতন পুরস্কার এবং আজকাল পুরস্কারও তার প্রাপ্তির ঝুলিতে রয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি চিত্রশিল্পে ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।

