শিশু দিবস

লেখক : মধুমিতা ঘোষ

চরিত্র: শিক্ষিকা ও চারজন ছাত্রছাত্রী
স্থান: ক্লাসঘর

শিক্ষিকা: আজ শিশু দিবস। বলো তো, জানো কেন আজকের দিনটা বিশেষ?
১ম: জানি ম্যাম। কারণ আজ আপনি আমাদের জন্য চকোলেট এনেছেন।
শিক্ষিকা: (হেসে) উঁহু! সঠিক জবাব না পেলে কিন্তু চকোলেটও পাবে না।
১ম: (চমকে) চকোলেটের সঙ্গে আবার সঠিক জবাবের কী সম্পর্ক ম্যাম?
সবাই: (হেসে ওঠে)
২য়: আমি জানি ম্যাম। আজ পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর জন্মদিন। আমরা তাঁকে চাচা নেহরু বলি।
৩য়: চাচা বলি কেন? উনি কি সত্যিই আমাদের চাচা ছিলেন?
শিক্ষিকা: তা নয়। তিনি শিশুদের খুব ভালবাসতেন। শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালবাসতেন। তাই শিশুরাও তাঁকে খুব ভালবেসে ‘চাচা নেহরু’ বলে ডাকত।
১ম: মানে আমরা যদি কাউকে খুব ভালবাসি, তাকেও ‘চাচা’ বলে ডাকব?
শিক্ষিকা: আরে বাবা, না, না! সবাইকে ‘চাচা’ বলে ডাকতে হবে না। ‘চাচা নেহরু’ ছিল আদরের ডাক।
৪র্থ: ম্যাম, উনি কি চকোলেটও দিতেন?
শিক্ষিকা: (হেসে) সেটা আমার জানা নেই। তবে তোমাদের মত শিশুদের হাসিমুখ নিশ্চয়ই দেখতে চাইতেন।
২য়: তাহলে আজ পড়াশোনা হবে না তো ম্যাম?
শিক্ষিকা: আজ বিশেষ দিন। তাই আজ তোমাদের একটু ছাড় দিলাম। আজ কোন বকাবকি নয়। পড়াবও না। আজ গল্প করব।
সবাই: ইয়েস! দারুণ ব্যাপার!
শিক্ষিকা: তবে একটা শর্ত আছে।
সবাই: আবার কী শর্ত ম্যাম?
শিক্ষিকা: আজ তোমরা তোমাদের মনের কথা বলবে। কী করতে ভালো লাগে, কী করতে ইচ্ছে করে, কী নিয়ে সমস্যা হয়—সব বলবে। আমিও তো কোন এক সময় তোমাদের মতই ছোট ছিলাম। দেখি, তোমাদের সঙ্গে আমার কতটা মিল আছে।
১ম: তাহলে আমি আগে বলি ম্যাম?
শিক্ষিকা: হ্যাঁ, তুমি বলো।
১ম: ম্যাম, বাড়িতে আমার কোন ভাইবোন নেই। তাই স্কুলে এলে আমার খুব ভাল লাগে। এখানে কত বন্ধু! সারাদিন তাদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমি একটু বেশি কথা বলি বলে সব টিচারের কাছেই বকুনি খাই।
শিক্ষিকা: (মুচকি হেসে) সেটা তো হবেই। ক্লাসে টিচার পড়াচ্ছেন আর তুমি গল্প করছ। তখন তো তোমার বন্ধুরাও পড়া শুনতে পারবে না। কথা বলতে খুব ইচ্ছে করলে দুটো ক্লাসের ফাঁকে বলবে, টিফিনের সময় বলবে, খেলার পিরিয়ডে বলবে। বুঝেছ?
১ম: বুঝেছি ম্যাম। কিন্তু একটা কথা বলি?
শিক্ষিকা: বলো।
১ম: গেমস পিরিয়ডটা আমার সবচেয়ে ভাল লাগে।
শিক্ষিকা: আমারও তোমার বয়সে গেমস পিরিয়ড খুব ভাল লাগত। মাঠে ছুটতাম, খেলতাম, বন্ধুদের সঙ্গে কত মজা করতাম। তখন তো মোবাইল বলে কিছুই ছিল না।
২য়: মোবাইল ছিল না? তাহলে আপনারা কী করতেন ম্যাম?
শিক্ষিকা: (হেসে) খেলতাম, বই পড়তাম, গল্প করতাম, পুতুল খেলতাম, লুকোচুরি খেলতাম।
১ম: সারাদিন?
শিক্ষিকা: না রে বাবা! পড়াশোনাও করতাম। এবার তুমি বলো।
২য়: ম্যাম, আমারও গেমস পিরিয়ড খুব ভাল লাগে। আর আমি খুব হাসি।
শিক্ষিকা: সেটা তো আমরা সবাই জানি।
২য়: (লজ্জা পেয়ে) তাই নাকি ম্যাম?
শিক্ষিকা: হ্যাঁ। ক্লাসে কেউ পানিশমেণ্ট পেলেও তোমার হাসি পায়। কেউ ভুল উত্তর দিলেও তোমার হাসি পায়। এমনকী স্যার রেগে গেলেও তোমার হাসি পায়।
সবাই: (হেসে ওঠে)
২য়: আমি কী করব ম্যাম? আমার হাসি পেয়ে যায়।
শিক্ষিকা: হাসি খারাপ নয়। কিন্তু সময় বুঝে হাসতে হয়। টিচার ক্লাস নিচ্ছেন, আর তুমি হেসে চলেছ—এটা ঠিক নয়। টিফিনে হাসবে, খেলতে গিয়ে হাসবে, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার সময় হাসবে। কিন্তু ক্লাসে মন দিয়ে পড়বে।
২য়: ঠিক আছে ম্যাম। কিন্তু বিকেলে মাঠে খেলতে যাব কী করে? কেউ তো খেলতে আসে না। সবার টিউশন থাকে। আর টিউশন না থাকলে মোবাইলে গেমস খেলে।
শিক্ষিকা: এই তো একটা বড় সমস্যা। পড়াশোনার প্রয়োজন আছে, কিন্তু সারাক্ষণ টিউশন আর মোবাইলও ঠিক নয়। মোবাইল ব্যবহার করবে, কিন্তু নিজের নিয়ন্ত্রণে। একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা নয়। আর শুধু গেমস খেলবে কেন? মোবাইল দিয়ে কত কিছু শেখা যায়, নতুন নতুন জিনিস জানা যায়, ভাল ছবি দেখা যায়, গল্প শোনা যায়।
২য়: তাহলে ম্যাম, মোবাইল খারাপ নয়?
শিক্ষিকা: মোবাইল খারাপ নয়। আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি সেটাই আসল কথা। ছুরি দিয়ে ফলও কাটা যায়, আবার কাউকে আঘাতও করা যায়। জিনিসটা নয়, ব্যবহারটাই গুরুত্বপূর্ণ।
সবাই: বুঝেছি ম্যাম।
শিক্ষিকা: এবার তুমি বলো।
৩য়: ম্যাম, আমার একটা সমস্যা আছে।
শিক্ষিকা: কী সমস্যা?
৩য়: আমার না, ক্লাসে বন্ধুদের সঙ্গে কোন না কোন কারণে ঝগড়া হয়ে যায়।
শিক্ষিকা: কেন?
৩য়: কখনও ও আমার ব্যাট নিয়ে নেয়, কখনও আমি ওর পেন নিয়ে নিই। আবার গেমস পিরিয়ডে কে আগে খেলবে, সেটা নিয়েও ঝগড়া হয়।
১ম: আর তুমি রেগে গেলে মারামারি করো।
৩য়: (রেগে) তুই চুপ কর!
শিক্ষিকা: এই তো! আজ শিশু দিবসের দিনেও শুরু করে দিলে?
৩য়: সরি ম্যাম।
শিক্ষিকা: রাগ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু রাগের মাথায় মারামারি করা একেবারেই ঠিক নয়। মনে রাখবে, স্কুলের বন্ধুর মত বন্ধু জীবনে আর পাওয়া খুব কঠিন। আজ যাদের সঙ্গে ঝগড়া করছ, কাল হয়ত তাদের কথাই সবচেয়ে বেশি মনে পড়বে।
৪র্থ: সত্যি ম্যাম। স্কুলের বন্ধুত্ব আলাদা।
শিক্ষিকা: একদম। আর তো মাত্র কয়েকটা বছর। এই কয়েকটা বছরই পরে সারাজীবনের মধুর স্মৃতি হয়ে থাকবে। তাই ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ঝগড়া নয়। একে অপরকে সাহায্য করবে, ভুল হলে ক্ষমা করবে।
৩য়: ঠিক আছে ম্যাম। আজ থেকে চেষ্টা করব মারামারি না করতে।
শিক্ষিকা: শুধু আজ নয়, সবদিন।
৩য়: সবদিন।
সবাই: ইয়েস ম্যাম!
শিক্ষিকা: এবার তুমি বলো।
৪র্থ: ম্যাম, আমি ছবি আঁকি। গল্প লিখি। স্কুল ম্যাগাজিনে আমার লেখা বেরিয়েছে।
১ম: ও কিন্তু খুব ভাল ছবি আঁকে ম্যাম।
২য়: গল্পও লেখে। তবে আমাদের নিয়ে গল্প লিখলে সাবধানে লিখবি!
সবাই: (হেসে ওঠে)
৪র্থ: কিন্তু একটা কথা ম্যাম। সবাই বলে, “এসব করে কী হবে? ছবি এঁকে বা গল্প লিখে কি জীবনে কিছু করা যায়?”
শিক্ষিকা: অবশ্যই যায়। প্রত্যেক মানুষের নিজের একটা ভাল লাগা থাকে, নিজের একটা প্রতিভা থাকে। কেউ ছবি আঁকতে ভালবাসে, কেউ গান গায়, কেউ খেলাধুলো করে, কেউ গল্প লেখে, কেউ বিজ্ঞান নিয়ে ভাবতে ভালবাসে। সেই ভাল লাগাটাকে যত্ন করে বড় করতে হয়।
৪র্থ: তাহলে আমি লেখালিখি চালিয়ে যাব?
শিক্ষিকা: অবশ্যই চালিয়ে যাবে। তবে এটাও মনে রাখবে, শুধু শখ থাকলেই হবে না। পড়াশোনাও করতে হবে। এই কঠিন বাস্তবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে গেলে শিক্ষার প্রয়োজন আছে।
৪র্থ: কতদূর পড়তে হবে ম্যাম?
শিক্ষিকা: অন্তত ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত মন দিয়ে পড়বে। তারপর তোমার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে নিজের মত করে এগিয়ে যাবে। তখন কেউ যদি বলে, “এটা করে কী হবে?”, তখন তোমার কাজই তার উত্তর দেবে।
৪র্থ: ঠিক আছে ম্যাম।
শিক্ষিকা: আর একটা কথা মনে রাখবে, শুধু বড় চাকরি করলেই বড় মানুষ হওয়া যায় না। ভাল মানুষ হওয়াটাই সবচেয়ে বড় কথা।
১ম: ম্যাম, ভাল মানুষ কীভাবে হব?
শিক্ষিকা: অন্যকে সম্মান করবে, মিথ্যা বলবে না, কারও বিপদে পাশে দাঁড়াবে, নিজের ভুল স্বীকার করবে, বাবা-মা ও শিক্ষকদের সম্মান করবে। আর যার সঙ্গে পারো, একটু ভাল ব্যবহার করবে।
২য়: ম্যাম, আজ এত ভাল ভাল কথা বলছেন যে মনে হচ্ছে আপনি আমাদের বকতেই ভুলে গেছেন।
শিক্ষিকা: (হেসে) আজ তো বলেই দিয়েছি, আজ বকাবকি নেই।
৩য়: তাহলে আজ হোমওয়ার্কও নেই?
শিক্ষিকা: বেশি বাড়াবাড়ি করো না!
সবাই: (হেসে ওঠে)
শিক্ষিকা: আজ শিশু দিবস। এই দিনটা শুধু আনন্দ করার দিন নয়। আজকের দিনে তোমরা সবাই মনে মনে একটা করে প্রতিজ্ঞা করো।
সবাই: কী প্রতিজ্ঞা ম্যাম?
শিক্ষিকা: মন দিয়ে পড়াশোনা করবে। নিজের প্রতিভাকে নষ্ট হতে দেবে না। মোবাইলের অপব্যবহার করবে না। বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া করবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা—ভাল মানুষ হওয়ার চেষ্টা করবে।
সবাই: আমরা প্রতিজ্ঞা করছি ম্যাম।
শিক্ষিকা: মনে থাকবে তো?
সবাই: মনে থাকবে!
শিক্ষিকা: তাহলে আজকের ক্লাস এখানেই শেষ।
১ম: কিন্তু ম্যাম, চকোলেট?
শিক্ষিকা: ও হ্যাঁ! এতক্ষণ তো ভুলেই গিয়েছিলাম।
২য়: আমি বলেছিলাম না, আজ চকোলেট পাব!
শিক্ষিকা: এই নাও সবাই। তবে একটা করে।
৩য়: ম্যাম, একটা করে কেন?
শিক্ষিকা: কারণ বেশি চকোলেট খেলে দাঁতের ক্ষতি হবে।
২য়: তাহলে আর একটা কাল দেবেন?
শিক্ষিকা: কাল আবার শিশু দিবস নয় তো!
সবাই: (হাসি)
শিক্ষিকা: আর যেহেতু আজ তোমরা সবাই এত ভাল কথা বললে, তোমাদের জন্য আরও একটা সুখবর আছে।
সবাই: কী ম্যাম?
শিক্ষিকা: তোমরা সবাই খেলতে ভালবাসো। তাই আজ তোমাদের একটা এক্সট্রা গেমস পিরিয়ড হবে।
সবাই: ইয়েস! দারুণ! থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম!
১ম: আজ কিন্তু আমি সবার সঙ্গে খেলব।
৩য়: আর আমি ঝগড়া করব না।
২য়: আর আমি হাসব!
শিক্ষিকা: হ্যাঁ, আজ প্রাণ খুলে হাসবে। আজ তোমাদের দিন।
সবাই: (একসঙ্গে) শুভ শিশু দিবস! নমস্কার।


লেখক পরিচিতি : মধুমিতা ঘোষ
পেশায় স্কুল শিক্ষিকা। বই পড়তে,বাগান করতে,গান শুনতে খুব ভালবাসি। বেড়াতেও খুব ভালবাসি।জঙ্গল আমার প্রিয়।গল্প লিখি।অনেক গল্প বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up