অনাথ

লেখক : শ্রীমতী

চশমাটা নাকে চেপে বসাতে গিয়ে টের পেল রতন ডানদিকের ডাঁটি তো কবেই ভেঙে গেছে। উঃ! সুতো দিয়ে বাঁধা, ঘা হয়েছে বলেই কানের পাশে এত লাগছে। ছানি এত ঘন হয়েছে যে আলো আর আঁধার এখন প্রায় একাকার। কত বছর ধরে এই এক ছন্দ। পা চালিয়ে সেলাই করতে থাকা। এবারের পুজোর অর্ডার এখনও শেষ হচ্ছে না। দু’-বাণ্ডিল জামার কাটিং এখনও ধরাই হয়নি। সব মাল হাটবারের আগেই শেষ করতে হবে। মেশিনের চাকা ঘোরানোর একটু বেকায়দায় বাঁ হাতের আঙুলে সূচ ফুটে রক্ত লেগেছে। কাপড়ের চেপে রাখা কোণায় রক্তের দাগ লেগেই রইল। সাদা ফ্যাকাশে আলোর মধ্যে খট্-খট্-খট্-খট্…। মেশিনটা এই রক্ত দেখেই কি থেমে গেল?

রাতটাই যা শত্রুতা করে, ঘুমে চোখের পাতা লেগে আসে। লোহার কালো অংশে কেমন একটা মরচে ধরা দাগ জামাকাপড়ে না লেগে যায়। তাই বারবার মোছে রতন। বর্ষার সময়টা ছাদ দিয়ে জল পড়ে। আর মেয়েটার কথা মনে পড়ে রতনের। এটা ফাইনাল ইয়ার। ডাক্তারি পড়া শেষ হচ্ছে। মেয়ের এখন কথা বলার সময়ও নেই। শুধু পড়ছে আর পড়ছে। এমন কাঙালের ঘরে কে কবে ডাক্তারি পড়েছে? মেয়েটার তুলনা হয় না। শুধু এই ছয়মাস মেয়েটা নাওয়া-খাওয়া ভুলে লড়ছে। একবার কথা হয়েছিল। রতন মনেও করতে পারে না। মেয়েটার জন্য এই জামাটা সরিয়ে রাখবে, নীল রঙ পছন্দ মেয়ের। একশো পিসের মধ্যে দু-একটা নষ্ট হলেও বাবু গিনতিতে ধরে না।

রতনের কাশির দমকে সেলাই কেঁপে যায়। “ইস”, সে বলে। কাশির টানে চাকার ছন্দ কেটে যায়। মেয়ের চিঠিটা রতন পড়াতেও পারেনি। কিন্তু বুঝতে পেরেছে টাকা চেয়েই পাঠিয়েছে মেয়ে। যেমন সবসময়ই হয়েছে। রতন স্ত্রীর সোনার হার বেচে মেয়েটাকে ডাক্তারিতে ভর্তি করানো। এরপর থেকে একদিনও দেখতে যায়নি সে এই চার বছরে। পাছে সেই টাকাটাও নষ্ট হয়। চশমাটা বারবার মোছে, রক্ত জল করা জলছাপটুকু শুষে নিতে চায়। এরকম অনেকদিনই হয়। দ্রুত লয়ে চলতে চলতে সূচ ফুটে যায় নিমেষে। কিন্তু আজ যেন ব্যথাটা পুরো হাতের পাতায় ছড়িয়েছে। একটা কাপড়ের ফিতে দিয়ে বাঁধন দিল। পরীক্ষার আগে টাকাটা পৌঁছতেই হবে। কিন্তু পার্সেলটা নিয়ে পোস্ট অফিসে যাওয়ার মত ক্ষমতা রতনের শরীরে আর অবশিষ্ট নেই। একটু বেশি জ্বর। কাঁপুনিও।

দরজার ঝাপ ঠেলে ঢুকল কাজ ডেলিভারির ছেলেটা। রতনের বড় ন্যাওটা। অবস্থা দেখে বলল, “কাকা! চল হাসপাতালে।” রতনের কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। ছেলেটা রতনকে চিকিৎসার বিভাগে ভর্তির পর রতনের মেয়েকে ফোন করতে যাচ্ছিল। রতন বলছে কিছু। ছেলেটা বলল, “কাকা, তুমি ঘুমাও।” সেই থেকে হুঁশ নেই। “পেশেণ্টের বাড়ির লোক”, হেঁকে গেল নার্সদিদি। আগেই রতনের জামার পকেট থেকে নার্স একটা কাগজ বের করে দিয়েছিল। ওটাই মেয়ের চিঠি। আর তাতে টাকা রেখেছিল রতন।

ছেলেটা চিঠিটা খুলল। কি জানি যদি জরুরি কিছু হয়। কাকার মেয়ের চিঠি। মেয়ে বিয়ে করেছে। এক অধ্যাপক ডাক্তারকে। তিনি জানেন রতনের মেয়ে অনাথ। তাঁর এক কাকা তাকে মানুষ করেছে। কাকা দর্জির কাজ করে। মেয়ে বাবাকে অনুরোধ করেছে। “তুমি আমাকে আর প্লিজ যোগাযোগ করবে না। আমিই অবস্থা বুঝে তোমার কাছে আসব। এই বিয়ে না করলে আমার পড়া আটকে যেত। তাই, বাধ্য হলাম।” ছেলেটা কাঁদছে। ভেবেছিল রতনকাকার মেয়েকে ফোন করবে। বলবে, “তুমি সত্যিই অনাথ হতে যাচ্ছ।”

চিকিৎসক জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি?”
ছেলেটা বলল, “আমি পালিত সন্তান, আমার কাকা।”
“আর কেউ আছেন বাড়ির লোক।”
ছেলেটা ঘাড় নাড়ল। বলল। “উনি অনাথ।”


লেখক পরিচিতি : শ্রীমতী
লেখক। গবেষক। অনুবাদক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up