আগমনী বার্তা

লেখক : মোঃ রমজান আলী

আজ ঘুম থেকে উঠে মনে হল, এমন দিনে কি আর কিছু না লিখে পারা যায়? আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি যতদূর পর্যন্ত দৃষ্টিসীমার গোচর, ততদূর পর্যন্ত কুয়াশার দখলে। এবং বাড়ির সামনে খেজুর গাছটার ঠিক মাথার উপরে লাল টকটকে সূর্য একটু উঁকি দিয়ে মাথা নাড়িয়ে তার উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। সুতরাং বুঝে নিলাম, শীত যেন তার আগমনী বার্তা দিচ্ছে।

চারিদিকে পক্ষীকূজন, ঝিঁঝিঁ এবং জোনাকির ঝিরিঝিরি কলতান, পরিবেশটা ভীষণ সুমধুর করে তুলেছে। ইতিমধ্যে একজন গাছিকে দেখলাম খালি পায়ে শিশিরে ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে খেজুরের রস সংগ্রহ করতে। বেশ অল্প কিছুদিন আগেই গাছটা কাটা হয়েছে এবং তা থেকে কেবল রস বের হতে শুরু করেছে। তার পাশে সরিষা ক্ষেতের কিছু অংশে সরিষা ফুল ফুটেছে। আবছা রোদের আলোয় শিশিরে ভেজা সরিষা ফুলে মৌমাছির পুষ্পে পুষ্পে মধু অন্বেষণ – দূর থেকে দেখা না গেলেও অনুভব অবশ্য করা যায়। আর একটু খেয়াল করে দেখলাম একজন গাছি বাঁকের দুই দিকে কয়েকটি রসের ভাঁড় নিয়ে দুলতে দুলতে আসছে‌। কিছুদিন আগে বৃষ্টি নামা দেখে অবশ্য বুঝেছিলাম আসতে চলেছে। ইতিমধ্যে পাশে খাট থেকে একটা কাঁথা নিয়ে গায়ে জড়িয়েছি। শীত বেশ জড়সড় হয়ে এখনও বসেনি, তবে কিছুদিনের মধ্যেই বসবে মনে হচ্ছে।

ইতিমধ্যে পাখিরা সব কিচিরমিচির করতে করতে দিনের আহার অন্বেষণে বেরিয়ে পড়েছে। আমার জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, সূর্য যেন তার পেখম মেলে রৌদ্রোজ্জ্বল্যে আলোকিত করেছে সমস্ত এলাকা। এই মৃদু শীতের সকালে চায়ে চুমুক দিতে দিতে রোদ পোহানোর লোভ আর সামলাতে পারলাম না।

যেমন ভাবনা তেমন কাজ। নিজেই নিজের চিনি ছাড়া এক কাপ চা বানিয়ে চিলেকোঠা থেকে একটা চেয়ার নিয়ে উঠে গেলাম ছাতে। ছাতের কোণায় আমার কিছু হাসনুহানা ফুলের গাছ আছে। শিশির ভেজা হাসনুহানা ফুলের সুগন্ধ তার সাথে মৌমাছির গুনগুন শব্দে যেন মন দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। আর অল্প কিছুক্ষণের ভিতর আরও মিষ্টি হতে শুরু করল। ইতিমধ্যে দেখলাম আহির রহিম চাচা তার গরুগুলোকে নিয়ে কুয়াশার মধ্য মিলিয়ে গেল। লোকটা সর্বঘাটের কাঁঠালি কলা, আমাদের খুব প্রিয়। লোকটার কপালে অষ্টমঙ্গলা জোটেনি। যাই হোক, বাড়ির পাশের ডোবা থেকে মাঝেমধ্যে মিটিমিটি ব্যাঙের ডাক শোনা যাচ্ছে। দূর থেকে আর একটু খেয়াল করে দেখলাম কিছু সাদা এবং গোলাপি রঙের কলমি ফুল ফুটেছে। আসলে পৃথিবীর এই সৌন্দর্য বর্ণনা করে প্রকাশ করা যাবে না, ভোরের শিশিরভেজা ঘাসে খালি পায়ে হাঁটা, কুয়াশার আবরণে ঢাকা প্রকৃতির স্নিগ্ধতা অনুভব করা, আর দিগন্তের বুকে ধীরে ধীরে জেগে ওঠা সূর্যের কোমল আলোয় নিজেকে হারিয়ে ফেলা – এ যেন পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যকে নিঃশব্দে হৃদয়ে ধারণ করা। ঘাসের ডগায় জমে থাকা প্রতিটি শিশিরবিন্দুতে লুকিয়ে থাকে একেকটি ক্ষুদ্র পৃথিবী, পাতার ফাঁকে ফাঁকে বয়ে যায় স্নিগ্ধ বাতাস, আর পাখির কলতানে মুখরিত হয়ে ওঠে নিস্তব্ধ প্রভাত। এমন এক সকালে দাঁড়ালে মনে হয়, পৃথিবী আজও তার সমস্ত ক্লান্তি ভুলে নতুন করে বাঁচতে জানে। প্রকৃতির এই অনাড়ম্বর সৌন্দর্যের কাছে জীবনের সমস্ত কোলাহল যেন মুহূর্তেই ম্লান হয়ে যায়। তখন বুঝতে পারি, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্যগুলো কখনও প্রাসাদে কিংবা বিলাসিতায় লুকিয়ে থাকে না; বরং লুকিয়ে থাকে শিশিরভেজা ঘাসে, কুয়াশামাখা পথে আর একমুঠো নির্মল সকালের নিঃশব্দ অনুভবে।

আজ আর কিছু লিখতে মন চাইছে না। মন চাইছে নিজেকে শিশির ভেজা ধানক্ষেতের আইলে শিশিরের প্রতিটি ফোঁটায়, ধানের প্রতিটি দানায়, ধানগাছের সাথে জাপটে লেগে থাকা শিশিরের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নিই। ধানক্ষেতের আইলে হাঁটতে হাঁটতে ধানগাছের উপরে হাত বোলাতে বোলাতে এ’ বেলাটা কাটিয়ে দিই। এ যেন কুহেলী উত্তরীর আবরণে ঢাকা নিস্তব্ধ প্রভাতে, শিশিরস্নাত তৃণভূমি যেন প্রকৃতির বুকে বিছিয়ে দেয় স্নিগ্ধতার এক অনিন্দ্য কাব্য।


লেখক পরিচিতি : মোঃ রমজান আলী
মোঃ রমজান আলী একজন নবীন কবি ও সাহিত্যপ্রেমী। তিনি ১৮ অক্টোবর ২০০৮ সালে সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার বড়ালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোঃ আলাল উদ্দিন এবং মাতা মোছাঃ মোহরজান খাতুন। তিনি বড়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা (PSC), বি. বি. আর. এন. এস. সম্মিলিত মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা (SSC) এবং সোনার বাংলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা (HSC) সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত। সাহিত্যপাঠের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই তাঁর লেখালেখির সূচনা। কবিতা, গল্প ও উপন্যাসসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তিনি লিখতে আগ্রহী। তাঁর লেখায় জীবনবোধ, মানবিকতা, প্রকৃতি, প্রেম, বিরহ ও আত্মঅন্বেষণের বিষয়গুলো বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up