আলতামণির গল্প

লেখক : অদিতি চ্যাটার্জি

রবিবার সন্ধ্যা – কপাল ভাল মেট্রোতে বসার জায়গাটা বাগানো গিয়েছে। বাপ রে, কী অসম্ভব ভিড়! এখন ‘নেতাজি মেট্রো স্টেশন’ অবধি নিশ্চিন্ত। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই একবার অলস নয়নে লেডিস সিটের দিকে তাকাই। টিঙ্কু দিদি আর ঝিলাম বসার জায়গা পেয়ে গিয়েছে। ঝিলামের কপালে প্রসাদী সিঁদুরের টিপ, ঘাম, কুচো চুল একেবারে জড়িমড়ি হয়ে আছে।
“শালা বাবু, বৌকে অত দেখতে নেই কিন্তু,” চোখটা মটকে বলেন জামাইবাবু। কথার একটা উত্তর দিতে যাচ্ছি, “আরে দেখো দেখো, পরের বৌকে তো আর দেখছ না! হাঃ হাঃ।”
“জামাইবাবু, আপনি একটা যা-তা !”
“আচ্ছা! হতেই পারি, পনের বছরের অভিজ্ঞতা রে বাবা, তুই কী বুঝবি, এই তো সেদিন বিয়ে করলি। হুম! চল্ আমি একটু চোখ বুজলাম।”

শ্যামবাজারে এসে ভিড়টা যেন আরও বাড়ল। ঝিলামদের দিকে তাকাই, কী মজাসে গল্প করছে। আমি আবার যেখানে সেখানে ঘুমোতে পারি না, মানুষজন দেখতে, ওদের গল্প শুনতেই বেশি ভালবাসি।
ঝিলামের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলার দিকে হঠাৎই চোখটা গেল। লাল-হলুদ সিল্কের শাড়ি, হাতে কাচের চুড়ি, ছোটখাট চেহারার মানুষটি আলতামণি না? তাই তো মনে হচ্ছে। লম্বা একটা সাপের মত বেণী, কী মসৃণ কালো হাত! মুখটা ভাল করে দেখা যাচ্ছে না। যাঃ, শোভাবাজার এসে গেল, আরও ভিড়। উঠে দেখব? টিঙ্কু দিদি কিছু বুঝতে পারছে না? ‘হাঁদি’-টা করছে কী?
আলতামণি! আলতামণি! আলতামণি!
ছটফটানিটাকে গলা চেপে ধরলাম। চোদ্দ বছরের বুবাই না আমি, চল্লিশ বছরের বিবাহিত, সম্মানীয় ব্যক্তি। ঝিলামের সামনে আর লোক হাসাতে হবে না। আর যদি ভদ্রমহিলা আলতামণি হনও, কিন্তু আমাকে চিনতে না চান, তাহলে সব্বার সামনে, ছিঃ ছিঃ…

শান্ত হয়ে চোখটা ধীরে ধীরে বন্ধ করলাম।


“মা, আর কতদিন আমি মাসিমণির বাড়িতে থাকব?”
“এই তো আর কিছুদিন, তারপর তুই আর আমি আবার একসাথে থাকব।”
“আর বাবা থাকবে না? ও মা, বলো না…”
“জানি না, ভাতটা শেষ করো এখন। সবাই খেতে বসবে। এই রকম করলে কিন্তু আমি আর তোমার সাথে দেখা করতে আসব না।”
মা আর আসবে না? বাবাও তো আসে না কতদিন! ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে, মুখের ভাত চিবাতে ভুলে যাই। জল একটু জল… মা তো আমাকে দেখছেই না! মা কি রাগ করল? কাঁদতে গিয়ে ভয়ে ভয়ে চুপ করে যাই।

মা টা-টা না করেই চলে গেল, এইবার আমি সত্যি কেঁদে ফেলি, যদি আর কোনদিনও মা না আসে! আমাকে বড়দি আর টিঙ্কু দিদি আদর করে দিচ্ছে।
“আদিখ্যেতাটা কীসের এত? ওর মা চলে গেল?”
ঠাকুমা বড্ড রাগী! কী রকম করে তাকায় আমার দিকে! সেই ঠাকুমার ঝুলির রাক্ষসী রাণীর মত! বড়দির কোল ঘেঁষে বসি আমি।
“বোনের ইভনিং ডিউটি আছে।”
“কি যে ছাতার মাথা কাজ! আছে ভাল – দায় নেই, দায়িত্ব নেই। বর কোথায় তার ঠিক নেই। ছেলেকে নিয়ে ভাবনা নেই।”
“মা, একটু থামো। বাড়িতে ছেলেমেয়েরা আছে।”
দশ বছরের আমি দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াই, ঠাকুমা এসব কি বলছে! বাবা কোথায় আমার?
মেসোর মনে হয় আমার দিকে চোখটা গিয়েছিল, তাই দাদার দিকে একটা ইশারা করার পর ফুটবলটা নিয়ে দাদা আর আমি মাঠে গেলাম। দৌড়াতে আমার ভাল লাগত না একদম। কিন্তু আজ ভয়ে ভয়ে দৌড়তে থাকলাম, ঠাকুমার সেই ‘রক্ত জল’ করা চোখের ভয়ে।

এখনও এই চল্লিশ বছর বয়সে এসেও ঠাকুমার সেই চোখদু’টোকে ভয় পাই, কতবার ঘুম ভেঙে উঠে বসেছি! এখনও ধড়ফড় করে চোখটা খুলে ফেলি।
মেট্রো এখন চাঁদনীতে। ঝিলামের পাশে আলতামণির মত দেখতে মহিলাটি বসার জায়গা পেয়েছে।
আহ্ দেখো, কী সুন্দর। আমার দিদি আর বৌ আমাকে দেখে হাত নাড়ছে! কি নিটোল জীবনই না আমার। অথচ ছোটবেলা, কিশোরবেলা মাসির বাড়িতে কাটিয়েছি বিষাক্ত মন্তব্য আর কৌতূহল শুনে। ভাবা যায়!
ভদ্রমহিলাকে আবারও দেখলাম ভাল করে। এটা আমার আলতামণি না, আলতামণি বড় নরম, ভিতু ছিল। এর শরীরের, মুখে সেই ‘কোমল’ ভাবটাই নেই। সোজা হয়ে বসি।


অশোক নগর কলোনিতে ছোটবেলা কাটানোর সময় আলতামণি ওখানে এসেছিল বুড়ো, মনা, সানির চাচি হয়ে সেই বিহারের ছাবড়া থেকে। ওদের বাবা, মানে কাশীকাকুদের দেশ ছিল, কাশীকাকুর ছোট ভাই প্রকাশের বৌ।
এক মাথা কমলা সিঁদুর, ‘রঙ্গ-বিরঙ্গি’ কাচের চুড়ি, পায়ে রুপোর চুটকি, কালো কোলো মানুষটাকে আমার বড় ভাল লাগত। গলার আওয়াজ শুনতেই পেতাম না, আলতামণি মানেই টুংটাং, খসখস। আর মিষ্টি হাসি।
ও হ্যাঁ, এই নামটা আমার দেওয়া, শুধু আমরা দুইজনেই জানতাম। টিঙ্কু দিদির মত বয়সী, কিন্তু সে পড়াশোনা করে না, নাচগান করে না, পুজো করে, রান্না করে, বাসন মাজে, এই সবেই তাঁর দিন কাটে।

আমি ছোট থেকেই আমার দুই দিদি ঘেঁষা, দাদা প্রায় দশ বছরের বড় ছিল। দিদিদের সাজগোজ, দিদিদের নাচ করা – এইসব দেখতে দেখতে আমারও ঐ টিপ পরে, গামছা দিয়ে চুল বেঁধে নাচ করতে বড্ড ভাল লাগত। মাসিমণির কাছে বায়না করে আমিও দিদিদের সাথে নাচের স্কুল যেতে লাগলাম।

নব্বইয়ের দশকে কেবল টিভি আসুক, কোক-পেপসির ঢল নামুক, কী ভারতে বিশ্ব সুন্দরীর প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হোক, কিন্তু আমাদের নিম্নমধ্যবিত্ত কি মধ্যবিত্ত কলোনিতে ছেলেদের নাচ মানেই ছিল কমেডি সিনেমা। আমি তো তখন জলজ্যান্ত কমেডি সিনেমা, তবু নাচ ছাড়তে পারিনি। রূপলেখা আণ্টিকে দেখতাম, কী বিভোর হয়ে আমাদের নাচ শেখাতেন, বলতেন, “এটাই কিন্তু পুজো, শিবের পুজো, কৃষ্ণের পুজো।” আমিও মুগ্ধ চোখে রূপলেখা আণ্টিকে দেখতাম শুক্রবার সন্ধ্যায় আর রবিবার সকালে, আর সারা সপ্তাহ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নাচ করতাম, রূপলেখা আণ্টিকে ভেবে। ঘুঙুরটা সব সময় পড়তাম না, আওয়াজে সবাই বিরক্ত হত তো!

তো সেই নাচই আমার আর আলতামণির মধ্যে সেতু হয়েছিল।
“তুমি নাচ করো? ছেলে হয়ে?
ক্লাস সেভেনের আমি, তখন নিজের জগৎকে বই, নাচ আর পড়াশোনার মধ্যে নিয়ে এসেছি। কলোনির বাইরে আমার জীবনে কোন ফিসফিস, হাসি, কৌতূহল নেই। আছে সম্মান আর আদর। তো বেশ গম্ভীর হয়ে উত্তর দিলাম, “হ্যাঁ, তাতে কী? অনেকেই তো নাচে, টিভিতে দেখো না? কামল হাসানের সিনেমাটা তো শনিবার দিন দেখলে। আমিও ঐ নাচটা শিখি।”
মিষ্টি একটা ভিতু ভিতু গলায় সে বলল, “আমারও খুব নাচ ভাল লাগে, জানো? তবে আমাদের দেশ গাঁয়ে তো ভাল বাড়ির মেয়েরা নাচগান করে না। আমাকে একদিন নাচ দেখাবে?”
কৌতূহলভরা দুই চোখ দেখে মনে হয়েছিল ঘন কালো মেঘের জানলার ফাঁক দিয়ে রোদ গলে পড়ল।


অশোক নগরের কলোনি এখন তো ছোট ছোট ফ্ল্যাটে ভরে গিয়েছে। ঘর, ব্যালকনিতে বাহারি পর্দা, এসি। কোন কোন বাসিন্দা আবার দুই কি চার চাকার মালিক। মেসো বা বুড়োদের ছিল মোটে দু’টো ঘর, সামনে দালান, দালানের গায়েই ছোট মত রান্নাঘর। সেখানেই আমরা মেঝেতে বসে খেতাম। খাওয়ার টেবিল ছিল না আমাদের। রঙ থাকলেও জীবন যাপনে ‘বাহার’টা ছিল না, ইচ্ছে থাকলেও। সেই বাহার আমি খুঁজতাম নাচের মধ্যে। এক রবিবার সন্ধ্যায় সাড়ে সাতটার উর্দু খবর শেষ, মেসো ক্লাব ঘরে আড্ডায় গিয়েছে। বাড়িটা মোটের ওপর ফাঁকা। আমি সেদিন ঘুঙুর পায়ে দিয়ে বিভোর হয়ে আয়নার সামনে নাচ করছি, এটাই আমার পুজো, রূপলেখা আণ্টির মত।
“এত নাচিস না, মেয়ে হয়ে যাবি।”
“হাঃ হাঃ হাঃ…”
থতমত খেয়ে যাই। পর্দা তুলে ঠাকুমা আর দাদার দুই বন্ধু। ঠাকুমার সেই রাক্ষুসি রাণীর চোখ! ক্লাস এইটে পড়ি, এখন আর দশ বছরের ছোটটা নেই, তবু কী ভয়! নাচ করলে মেয়ে হয়ে যাব? আমি মেয়ে…

“আরে প্রকাশ বৌটার গায়ে কেরোসিন ঢেলে দিয়েছে…” কে একজন চিৎকার করে উঠল বাইরে।
ঠাকুমারা আমাকে ভুলে দৌড়ল বুড়োদের বাড়ির দিকে। আমি কিছু সময় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম, ফাঁকা মাথায়। তারপর মনে পড়ল আলতামণি ! কী হ’ল ওর? ঠেঙানি তো রোজ খেত। ক্লাবের কাকু, মেসোরা এক-দু’বার বকেছে প্রকাশকে, ঠেঙানি কেন দেয়? বৌকে বলে। তবে এরাও তো বাড়িতে গিয়ে হয় ঠেঙানি দেয়, বৌ -মেয়ে কে নাহলে গাল পাড়ে মদ খেয়ে এসে। তবু যতটা সামলে থাকা যায়, আর কী। হাজার হোক, ভদ্রলোক বলে কথা। তবে আজ ব্যাপারটা একটু গুরুতর হয়ে গিয়েছে। যদি আগুন লেগে যেত!

সবাই এখন ক্লাব ঘরে। দিদিরা সবাই আলতামণির কাছে। আমি ঘুঙুরটা বুকে নিয়ে বসে।


“বাড়িতে চলে যাও না কেন আলতামণি? কী মার তোমাকে মেরেছে প্রকাশটা।”
কালো দু’টি চোখ কী শান্ত! সারা হাতে পিঠে কালশিটের দাগ। আলতামণি মাসির কাছে এসেছিল চিনি চাইতে। চিনি! আলতামণির জীবনে যেটা আর নেই।
“উপায় নেই রে ভাইয়া, বদনামীর ভয় আছে। বাবা ফিরিয়ে নেবে না। আসলে আমি তো দেখতে খারাপ, প্রকাশের পছন্দ হয়নি।”
মনে মনে ভাবি গাধাটা অন্ধ।
“এই শুক্রবার ‘ওলা বিবি জোলা বিবি’-র মন্দিরে যাবি? ঘোড়া দিয়ে মানত করে আসব। সবাই বলছে, যদি প্রকাশের মন পাওয়া যায়।”
হায় রে আলতামণি! ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলি।

তবে আলতামণির আর শুক্রবার সন্ধ্যায় মন্দিরে যায়নি। তার আগেই ওর এক দেশোয়ালি দেবরের সাথে অন্য কোথাও চলে গিয়েছিল। আর ‘বদনামী’-কে ভয় না পেয়ে। প্রায় বছরখানেক আলতামণি চর্চায় ছিল এত বড় কাণ্ড ঘটিয়ে। প্রকাশটাও শান্ত হয়ে গিয়েছিল, লজ্জায়। বৌ পালিয়েছিল না!

খালি আমি আলতামণির মত সাহসী হতে পারলে ঠাকুমাকে বলে দিতাম, “পুরুষরা নাচ করলেই তারা মেয়ে হয় না। এটা অনেক জটিল বিষয়। তোমার মাথায় ঢুকবে না।”


জামাইবাবু একটা চিমটি কাটছে, “কী রে তোর ধ্যান হ’ল?”
টালিগঞ্জ ছেড়ে গিয়েছে, ধীরে ধীরে গেটের দিকে এগোচ্ছি, আলো ঝলমলে ফিতের মত চেনা পথ আমার ওপর থেকে দেখি।

ঠাকুমাকে বলা উচিত ছিল কথাগুলো আমার, তাহলে বোধহয় রাক্ষসী রাণীর চোখদু’টো আমাকে আর ভয় দেখাতে পারত না। যদি বলতে পারতাম, যদি পারতাম…


লেখক পরিচিতি : অদিতি চ্যাটার্জি
আমি অদিতি চ্যাটার্জি, অল্প কিছু গল্প লিখেছি। শব্দ রেণু প্রকাশনীর বৈশাখের ত্রৈমাসিক সংখ্যায় আমার একটা লেখা প্রকাশিত হয়েছে "আহ্লাদিনী রাধে" শিরোনামে। পাঠক হিসাবে আমার সব ধরণের লেখা পড়তেই ভাল লাগে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up