লেখক : শমিতকুমার দাস
১৯৭৮। সে বছর বিশ্বকাপের আসর বসল আর্জেন্টিনায়। ততদিনে ফুটবল সম্পর্কে নয়ন কিঞ্চিৎ উন্মীলিত হয়েছে। তার আগের বছরই পেলে এসেছিলেন কলকাতায় মোহনবাগানের বিরুদ্ধে খেলতে আমেরিকার কসমস ক্লাবের হয়ে। সেই প্রথম আর শেষ সরাসরি পেলের খেলা দেখলাম। পেলে নিজের খেলা খেলেন নি, স্রেফ দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরদিন কাগজে বের হ’ল বর্ষার ইডেনের নরম মাটিতে চোট লাগার ভয়ে তাঁর ইনসিওরেন্স এজেন্ট তাঁকে মাঠে নামতেই দিতে চান নি। কিন্তু মাঠ ভর্তি লোক গেছে শুধু পেলে নামের টানেই। তাঁর পায়ের জাদুর আকর্ষণে যা ততদিনে মিথ হয়ে গেছে। পেলে মাঠে না নামলে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে তাকে সামলাবে কে? পেলেকে বোঝানো হলো সামগ্রিক পরিস্থিতি। পেলে বুঝলেন, নামলেন, কিন্তু বেশি নড়াচড়া করলেন না। স্টেডিয়াম ভর্তি লোকের, ‘ভরিল না চিত্ত’। অনেকেই বললেন পেলের চেয়ে বিদেশ বসু ভাল খেলোয়াড়। বিদেশ বসু সেই ম্যাচে দারুণ খেলেছিলেন সন্দেহ নেই। তিনি নামার পরেই মোহনবাগান দুটো গোল পায়। ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত ২-২ হয়েছিল। আমি আদৌ খুশি হই নি, কারণ তার বছর দুয়েক আগেই আমি সেই ঐতিহাসিক শিল্ড ফাইনালের দিন ইস্টবেঙ্গলে দীক্ষা নিয়েছি। ১৯৭৫-এর সেই ফাইনালে মোহনবাগানকে ৫-০ গোলে হারানোর আনন্দ অবশ্য পরের বছর লীগে আকবরের করা পনের সেকেন্ডের গোলে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং কসমসের বিরুদ্ধে মোহনবাগানের কৃতিত্বে খুশি হওয়ার বদলে গা জ্বলে যাওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। আর পেলের সঙ্গে বিদেশের ওরকম হাস্যকর তুলনা একেবারেই মানতে পারি নি। কারণ ততদিনে জয়ন্ত দত্তর পেলের ডায়রি পড়ে ফেলেছি। তাঁর কৃতিত্ব স্বচক্ষে না দেখলেও জেনে গেছি তিনি তুলনাহীন। ব্রাজিলকে তিনি চিরকালের জন্য জুলে রিমে কাপ জয় করে দিয়েছেন। সেই পেলে সেদিন কলকাতায় হতাশ করলেও ভক্তির মুগ্ধতা যায় নি। আজও তা বর্তমান এবং তাঁর কারণেই এই দুর্দিনেও আমি ব্রাজিলের সমর্থক হয়েই থেকে গেছি।
এরমধ্যে আমার জন্মের পর দুটো বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর হয়ে গেছে। ১৯৭০ এবং ১৯৭৪ সালে। আমার বয়স যথাক্রমে এক এবং পাঁচ। তাই ব্রাজিলের জুলে রিমে কাপ জিতে নেওয়ার দিন আমি পৃথিবীতে বর্তমান থাকলেও তার আনন্দের ভাগীদার হতে পারি নি। কে জানে ব্রাজিল যখন ৪-১ গোলে ইতালিকে হারিয়ে চিরতরে জুলে রিমে কাপ জিতে নিচ্ছে, তখন হয়ত আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হেসেছিলাম। ১৯৭৪-এর বিশ্বকাপের খেলাও আমি দেখি নি। জানতামও না সেই বছর ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর বসেছে পশ্চিম জার্মানিতে। খেলা বোধহয় ভারতের কেউই দেখেন নি, কারণ বিশ্বকাপের খেলা দেখানোর যথাযথ আয়োজন ভারতে ছিল না। বাঙালির ফুটবল তখনও ইস্টবেঙ্গল -মোহনবাগান কেন্দ্রিক।
এবার ১৯৭৮। আগের বছরই পেলে এসেছেন। সুতরাং বিশ্ব-ফুটবলের ছোঁয়াচ বাঙালি পেতে শুরু করেছে। ৭৮-এর বিশ্বকাপ ঘিরে তাই একটা উন্মাদনা তৈরি হচ্ছিল। আনন্দমেলা পত্রিকা বিশেষ সংখ্যা করেছিল। আমার কছে সেই পত্রিকার মাধ্যমেই প্রথম দরজা খুললো বিশ্ব-ফুটবলের। চমৎকার ছিল পত্রিকাটা। যত্ন করে রাখি নি বলে এখন বড়ো আফশোস হয়। তবে সেখানে ছবিতে বিশ্বকাপের ধারাবাহিক ইতিহাস বের হতে শুরু করেছিল। ১৯৭৪ পর্যন্ত সব বিশ্বকাপের কথা সেখান থেকেই জানতে পারি। কেটে রেখে দিয়েছিলাম সেই ছবিতে ইতিহাস। আজও আছে আমার কাছে। পরবর্তীকালে ক্রীড়া-সাংবাদিকতা করার সময় যা আমায় খুবই সাহাষ্য করেছিল। পত্রিকার কথায় মনে পড়ল মজার ঘটনা। ১৯৭৭ সালে পেলে ভারতে আসার আগেও আনন্দমেলা এমনই এক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। তখন আনন্দমেলা ছিল মাসিক। তো আমি তখন অত খবর রাখতাম না। হঠাৎ দেখলাম এবং জানলাম পত্রিকাটার কথা৷ ভাবলাম আমায় পেতেই হবে। খবরের কাগজ যিনি দিতেন, তাঁকে বললাম। বললেন, খোকাবাবু ও বই তো আর নেই, পাওয়া যায় না। বাবা তবুও বিভিন্ন পত্রিকার স্টলে খোঁজ করলেন আমার আব্দারে। নেই, নেই, সে কোথাও নেই। আমদের পাশের বাড়িতেই থাকতেন বাবার দুই পিসতুতো দাদা এবং এক ভাই। বড়ভাই ধনজেঠুর ছেলে ড্যাম্বলদা (ভালো নাম অশোক দাস)-র মেয়ে লোপা আমার চেয়ে বছরখানেকের ছোটো। আমরা কাকা-ভাইঝি হলেও ছিলাম বন্ধুর মতো। ড্যাম্বলদা তখন ত্রিপুরায় চাকরি করে। কয়েকদিন বাদে আসার কথা। লোপা আশ্বাস দিল ড্যাম্বলদা আসার সময় বইটা নিয়ে আসবে। আমি কূলহারা বেদনার সাগরে দ্বীপ দেখতে পেলাম। প্রতীক্ষা শুরু হলো। যথাসময়ে ড্যাম্বলদা এলো। বইয়ের আশায় গেলাম এলাম গেলাম। এমন দিনদুয়েক চলার পর বুঝলাম ড্যাম্বলদা আনন্দমেলার বিশেষ সংখ্যার ব্যাপারেই আদৌ ওয়াকিবহাল নয়। লোপা পুরোটাই বানিয়ে বলেছে। হয়তো বা আমার দুঃখে প্রলেপ দেওয়ার সৎ উদ্দেশ্যেই। আশ্চর্যের বিষয় বড়ো হয়ে পুরনো বইয়ের দোকানে যাতায়াত শুরু করার পর অনেক পুরনো পত্রিকা দেখেছি। কিন্তু পেলে সংখ্যা আনন্দমেলা কখনো চোখে পড়ে নি। যাঁরা সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন, পেলেকে ভালোবেসে তাঁরা বোধহয় পত্রিকাটাকে আর হাতছাড়া করেন নি।
মূল বিষয় থেকে সরে এলাম কি? আসলে আমার কাছে বিশ্বকাপ মানে পেলে,– যদিও কোনোদিন বিশ্বকাপে তাঁর খেলা দেখি নি — আর ব্রাজিল। আজ পেলে ইহজগতে নেই। পেলেহীন পৃথিবীতে প্রথম বিশ্বকাপ চলছে, আর আমি ব্রাজিলের দিকে উন্মুখ আগ্রহে তাকিয়ে আছি এই বয়সেও। আমার ব্রাজিল সমর্থক হওয়ার পিছনে একটা নাম আর তাঁকে নিয়ে লেখা একটা বই। একথা বলছি কারণ খেলার জগতে সেই ছোট্ট বয়সে আমার সমর্থন নির্ভর করতো আমার খুড়তুতো দাদা গোরাদার ওপর। ইস্টবেঙ্গল সমর্থক হওয়ার ক্ষেত্রে পাঁচ গোলে জেতার চেয়েও বড়ো ছিল গোরাদা ইস্টবেঙ্গল সমর্থক। ক্রিকেটে আমি বিশ্বনাথের ফ্যান কারণ গোরাদাও তাই। শুধু ব্রাজিলের বেলায় ব্যতিক্রম। গোরাদা ৮৬ বিশ্বকাপ থেকে কোনো এক মারাদোনার জন্য আর্জোন্টিনার সাপোর্টার হয়ে গেল। তার আগে কার সাপোর্টার ছিল জানতে পারি নি। কারণ আমাদের দেশে তার আগে বিশ্বকাপের সব খেলা দেখানো হত না। আর আমি তখন এতোটাই ছোটো যে গোরাদার সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনার কথাও মনে আসে নি। একসঙ্গে বসে খেলা দেখলে হয়তো জানতে পারতাম, যেমন ছিয়াশি আর নব্বইতে দেখেছিলাম। তেমন সুযোগ টেলিভিশন আমাদের দেয় নি।
যেমন ১৯৭৮-এই বোধহয় শুধু ফাইনাল দেখানো হয়েছিল। সেই প্রথম সরাসরি বিশ্বকাপ। আর দেখানো হয়েছিল তৃতীয়-চতুর্থ স্থান-নির্ধারক ব্রাজিল-ইতালি ম্যাচ। সেই প্রথম ব্রাজিলের খেলা স্বচক্ষে দেখা। আমাদের তখন টিভি নেই। পাড়ায় কজনের বাড়িতেই বা ছিল? সেটা ছিল টিভির আদিম যুগ। ছাদে অ্যান্টেনা একটা স্ট্যাটাস-সিম্বল। পেলের খেলা দেখেছিলাম রাজুদার বাড়িতে। রাজেন চোপড়া। বিশ্বকাপ ফাইনাল আর তৃতীয়-চতুর্থ স্থান-নির্ধারক খেলাদুটো পাড়ার ডাব্লুদের বাড়ির সাদা-কালো টিভিতে । ডাব্লুদের বাড়ি পাঁচদিন ধরে টেস্ট ম্যাচও দেখেছি। দেখেছি ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান খেলা ও আরও লীগের খেলা দিনের পর দিন।কেউ কিছু মনে করত না। যেন সেটাই ছিল স্বাভাবিক। বরং সকলে মিলে বসে খেলা দেখার মজাই ছিল আলাদা। আড্ডা-গল্পে, টীকা-টিপ্পনিতে মশগুল থাকত সব। মাঝে মাঝে কোনো বিশেষ অজ্ঞের হাস্যকর মতামত। দেখতে দেখতে মানুষ কেমন পাল্টে গিয়ে ক্ষুদ্র খোপে একক হয়ে গেল।
থাক সে কথা। সেদিনের মানে ৭৮-এর বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা ৩-১ গোলে নেদারল্যান্ডসকে হারালেও তাদের ফাইনালে ওঠাটাই ছিল সন্দেহজনক। সেবার চারটে গ্রুপে ছিল ষোলোটা দল। প্রতি গ্রুপের প্রথম দুটো দল পরের পর্যায়ে যেত। সেখানে আটটা দলকে দুটো গ্রুপে ভাগ করে নেওয়া হত। প্রতি গ্রুপের প্রথমে থাকা টিমদুটো খেলতো ফাইনালে। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা ছিল একই গ্রুপে। শেষ ম্যাচের আগে দুদলের পয়েন্ট সমান। গোল পার্থক্যে ব্রাজিল এগিয়ে। ব্রাজিলের আবেদন ছিল তাদের আর আর্জেন্টিনার শেষ ম্যাচ একইসঙ্গে দেওয়া হোক। নিজেদের দেশে খেলার সুযোগ নিয়ে আর্জেন্টিনা সে কথায় কর্ণপাত না করে ব্রাজিলের খেলা আগে দেয়। দেখা যায় শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে ছয় গোলে জিততেই হবে পেরুর বিরুদ্ধে। পেরু তখন যথেষ্ট ভালো দল। ছ গোল খাওয়ার মতো কোনোমতেই নয়। কিন্তু সেই অবিশ্বাস্য ফলই হলো। দক্ষিণ আমেরিকার সব দেশই স্প্যানিশভাষী, ব্যতিক্রম পোর্তুগীজভাষী ব্রাজিল। সে কারণে বিশাল জায়গা নিয়ে অবস্থান করলেও অন্যান্য দক্ষিণ আমেরিকান দেশগুলো তাকে পছন্দ করে না। তাই পেরু স্বচ্ছন্দে সহভাষী দেশের ফাইনালের রাস্তা প্রশস্ত করেছিল। এ বিষয়ে কারও সন্দেহ থাকলে, উইকিপিডিয়ার তথ্য তাকে আসল সত্য জানিয়ে দেবে।
লেখাটা হঠাৎ কেমন রাগী রাগী হয়ে গেল না? আসলে সেই প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে ব্রাজিলের ওপর অবিচারের রাগ আমার আজও যায় নি। সেবার যা খেলছিল ব্রাজিল, ফাইনালে গেলে চ্যাম্পিয়ন হতই।
১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপের কোনো খেলাই দেখা হয় নি। সেবার বোধহয় চারটে খেলা দেখানো হয়েছিল। দুটো সেমি ফাইনাল, ফাইনাল আর তৃতীয়-চতুর্থ স্থানাধিকারী ম্যাচ। আমি নিশ্চিত নই। কারণ বাড়িতে তখনও টিভি আসে নি, আমার টাইফয়েড হলো সেইসময়, ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালির কাছে হেরে আমার বিশ্বকাপের উৎসাহে জল ঢেলে দিল। বরং আমি অনেক বেশি উত্তেজিত ছিলাম পাঁচবছর বাদে ইস্টবেঙ্গল কলকাতা লীগ জেতায়। তখনও কলকাতা ফুটবল নিয়ে পুরো ভারত জুড়েই চর্চা হত। শুনলাম ইতালি বিশ্বকাপ জিতেছে। পাওলো রোসি সেই জয়ের প্রধান স্থপতি। কয়েকবছর আগে রোসিও চলে গেছেন স্বর্গের স্টেডিয়ামে।
১৯৮৬তেই প্রকৃত বিশ্বকাপ দেখা। তার আগে ১৯৮৩ সালে ভারত ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতায় ক্রিকেট নিয়ে একটা উন্মাদনা ধীরে ধীরে ভারত জুড়ে জেগে উঠছে, কলকাতাও তার ব্যতিক্রম নয়। আমি হাওড়ার যে পাড়ায় থাকতাম তা শিক্ষিত মধ্যবিত্তর পাড়া৷ সুতরাং অনেক ভালো কিছুর সঙ্গে কিছু স্নবারিও ছিল। যেমন ফুটবল ঠিক যেন অভিজাত খেলা নয়, অন্তত ভারতে তো নয়ই। আমরা অবশ্য পাড়ায় দুটো খেলাই খেলতাম। গ্রীষ্ম-বর্ষায় ফুটবল, শীতে ক্রিকেট। তবে ক্রিকেটের টুর্নামেন্ট প্রতিবছর খেললেও ফুটবলের কোনো টুর্নামেন্ট কখনো খেলতে যাই নি। কিন্তু আমি নিজে চিরকাল দশটা দেশের খেলা ক্রিকেটের চেয়ে বিশ্বব্যাপী ফুটবলকে বেশি ভালোবেসে এসেছি। তাই বিরাশির বিশ্বকাপের আগেই কলকাতায় সদ্য শুরু হওয়া নেহেরু কাপে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দল যখন এলো যথেষ্ট উত্তেজনা বোধ করেছিলাম। সেই প্রতিযোগিতায় মুগ্ধ করে গেল উরুগুয়ের এনজো ফ্রান্সিস কোলি, রামোস, গঞ্জালেস, যুগোস্লাভিয়ার লায়লা এবং আরও কয়েকজন। চ্যাম্পিয়ন হলো উরুগুয়ে। আমরা বুঝতে শুরু করলাম ভারতীয় ফুটবল কতটা পিছিয়ে। চুরাশিতে এলো আর্জেন্টিনা। লম্বা চুলের গ্যারেকাকে আজও ভুলিনি। ছিলেন বুরুচাগা, পোনসে, পোল্যান্ডের বুনসল, স্মোলারেক। আরও কতজন, এতোদিন বাদে সব নাম মনে নেই। তবে মনে আছে দু বছর বাদে আর্জেন্টিনার যে দলটা চ্যাম্পিয়ান হয় বিশ্বকাপে সে দলে বুরুচাগা, পোনসে সহ ভারতে খেলে যাওয়া টিমের অনেকেই ছিলেন, যে দলের সঙ্গে চমৎকার লড়াই করে শেষ মুহূর্তের গোলে হেরেছিল ভারত। এমনকি সেই দলের কোচ কার্লোস বিলার্দোই ছিলেন বিশ্বজাপজয়ী আর্জেন্টিনার কোচ। তবু বাঙালির ফুটবল বিমুখতার সেই সূচনা ক্রমশ মহীরূহ হয়ে উঠল। সে প্রসঙ্গ স্বতন্ত্র।
ছিয়াশিতেও প্রথমদিকে ভারতে খেলা দেখাচ্ছিল না। বাংলাদেশে দেখাচ্ছিল। তাই বুস্টার কেনার ধূম পড়ল। ততদিনে পাশে গোরাদাদের বাড়িতে টিভি এসে গেছে। তবে বুস্টার লাগানো হয় নি। আমি আর আমার বন্ধু দেবু পাড়ায় উদয়দাদের বাড়িতে গেলাম প্রথম খেলা দেখতে। ইতালি বনাম বুলগেরিয়া। খুবই ক্লান্তিকর খেলা। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ইতালি এক গোলে জিতেছিল। সম্ভবত, ভুলও হতে পারে, প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে খেলা দেখাচ্ছিল আমাদের দেশে। কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের সঙ্গে খেলা পড়ল ফ্রান্সের। তখনকার ব্রাজিল, জিকো, সক্রেটিস সমৃদ্ধ অসাধারণ দল। স্ট্রাইকার কারেকা। কিন্তু ফ্রান্সের সঙ্গে জিকোর পেনাল্টি মিস সব স্বপ্নের জলাঞ্জলি ঘটালো। ব্রাজিল জিতছিলো। হঠাতই, বলা যায় খেলার গতির বিরুদ্ধে ফ্রান্স গোল শোধ করে। খুড়তুতো দাদা চন্দন (যদিও আমার চেয়ে অনেকটাই বড়ো, তবু চিরকাল নাম ধরে ডেকে এসেছি, আজও তাই। আসলে ছোটো থেকেই আমাদের সম্পর্ক বন্ধুর মতো) বেশ আনন্দিত হয়ে ওঠে। আমার মনে হয় ও ব্রাজিল বিরোধী। গোরাদা হেসে বলে আমরা ভালো খেলা দেখতে চাই। কারও সাপোর্টার বা বিরোধী নই। সেই গোরাদা ঐ বিশ্বকাপ থেকে আর্জেন্টিনার সাপোর্টার হয়ে গেল। ভেবে দেখলে রবীন্দ্রভক্ত আমারও আর্জেন্টিনার সাপোর্টার হওয়াই উচিত ছিল। আর্জেন্টিনার লেখিকা ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর মাধ্যমে আর্জেন্টিনার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ব্রাজিলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগের কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। কিন্তু খেলার জগৎ আলাদা। সেখানে একবার কাউকে মন দিলে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। আমার অনেক প্রিয় ব্যক্তিত্বও মোহনবাগানের সমর্থক ছিলেন। যেমন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তাতে কি আমি ইস্টবেঙ্গলকে সমর্থন করব না? না কি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানে ডুব দেব না? ঐ খেলায় ব্রাজিল পরে পেনাল্টি পায়। তখন বিশ্বের সেরা পেনাল্টি শ্যুটার জিকো অবিশ্বাস্যভাবে সেটা মিস করেন। খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। হেরে যায় ব্রাজিল।
এই বিশ্বকাপেই মারাদোনার সেই বিতর্কিত হাত দিয়ে গোল। ইংল্যান্ডের প্রতিবাদে কর্ণপাত করেন নি রেফারি। অনেক বছর পরে মারাদোনা নিজেই স্বীকার করেছিলেন গোলটা হাত দিয়েই ছিল। ঐ একই ম্যাচে চারজনকে কাটিয়ে মারাদোনার অসামান্য গোল, যা বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা গোলগুলোর একটা। হাত দিয়ে গোলটা না হলে, যাকে মারাদোনা পরে বলেছিলেন ‘হ্যান্ড অফ গড’, আর্জেন্টিনা কি আদৌ চ্যাম্পিয়ন হত? আর্জেন্টিনার প্রথম দুটো বিশ্বকাপ জয়েই লেগে আছে তঞ্চকতার কালিমা। তবু অস্বীকার করা যায় না মারাদোনা ঐ বিশ্বকাপে অবিশ্বাস্য খেলেছিলেন। নিজে দুর্দান্ত গোল করেছিলেন, অন্যদের দিয়ে করিয়েছিলেন। পুরো একটা প্রজন্ম, যারা ততটা ব্রাজিল ছিল না, তারা সকলেই মারাদোনার জাদুতে আর্জেন্টিনার ভক্ত হয়ে গেল। অনেক বছর পরে স্কুলে চাকরিতে ঢোকার পর দেখেছি আমাদের বয়সী বা আমার চেয়ে ছোটরা বেশিরভাগই আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। মনে হত কলকাতায় বোধহয় আর্জেন্টিনার সমর্থক আর ব্রাজিলের সমর্থকের অনুপাত ষাট-চল্লিশ। মেসির দৌলতে ফারাক আরও কি বেড়েছে? কে জানে।
ছিয়াশির বিশ্বকাপের সময়ই প্রথম মেগাস্টার কথাটা শুনি। জিকো, প্লাতিনি, মারাদোনা এঁরা সুপারস্টারের স্তর ছাড়িয়ে মেগাস্টারে পরিণত। খুব সম্ভব টুকুন বলেছিল কথাটা। বিশ্বকাপের রেশ ধরে বাজারে এসেছিল খেলোয়াড়দের ছবি সম্বলিত তাসের আকারের কার্ড। কোনো কিছুর সঙ্গে দিচ্ছিল না এমনি বিক্রি হত মনে নেই। তবে বেশ কিছু কার্ড যোগার করেছিলাম। যার মধ্যে ব্রাজিলের কারেকা, জিকো, হল্যান্ডের রাইকার্ড, ফ্রান্সের প্লাতিনি, পশ্চিম জার্মানির লোথার ম্যাথাউস, আর্জেন্টিনার বুরুচাগার ছবি ছিল বলে মনে পড়ছে। আরও কোন কোন খেলোয়াড়ের কার্ড ছিল মনে নেই, তবে বেশ একগোছা ছিল মনে আছে। কালস্রোতে সেসব কার্ডও কোথায় ভেসে গেছে। এখন অবশ্য তার দরকারই বা কী? ইন্টারনেট তো সবই সহজলভ্য করে দিয়েছে। তবু মাঝে মাঝে কার্ডগুলোর কথা মনে পড়লে হৈমন্তিক বিষণ্ণতা অল্প সময়ের জন্য হলেও ঘিরে ধরে।
১৯৯০ বিশ্বকাপের শুরুতেই অঘটন। আর্জেন্টিনা হারল নবাগত ক্যামেরুনের কাছে। সেদিন আমার আনন্দে গোরাদার কী রাগ। বলেছিল, ‘ভালোই হলো। রাত জেগে আর খেলা দেখতে হবে না। ক্যামেরুন উঠলে তো আর খেলা দেখার প্রশ্ন নেই।’ ক্যামেরুন উঠেছিল। আর্জেন্টিনাও।গ্রুপে তৃতীয় হয়ে। ব্রাজিল- আর্জেন্টিনা ম্যাচ আবার প্রি-কোয়ার্টারে। সেবারও ব্রাজিল দুরন্ত খেলছিল। নিশ্চিত ছিলাম ব্রাজিল জিতবেই। ভয় শুধু বেঁটেখাটো ফুটবলারটাকে। যথারীতি মারাদোনার অসাধারণ পাস থেকে ক্যানিজিয়া আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দিল। গোরাদা চেঁচিয়ে উঠল গোল। আমি রাগে-দুঃখে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে নিজের বাড়ি এসে দোতলায় অন্ধকার বারান্দায় বসে রইলাম। এবারও হলো না? দুঃখে ভেঙে গেল মনটা। সেদিন আর খেলা দেখি নি। শুনেছিলাম ব্রাজিল আবার পেনাল্টি মিস করেছিল। আর্জেন্টিনার পরের ম্যাচ কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের সঙ্গে। আমি বেলজিয়ামকে সমর্থন করছি দেখে খেলা দেখতে আসা পাড়ার বুড়োদা বলল, ‘তোর তো আর্জেন্টিনার ওপর রাগ ব্রাজিলকে হারিয়েছে বলে। কিন্তু তুই যুক্তি দিয়ে ভাব মারাদোনার মতো খেলোয়াড় কি ব্রাজিলে আছে?’ বললাম, ‘মারাদোনা ভালো, তবে পেলে নয়।’ যেন পেলের খেলা দিনের পর দিন দেখেছি। ‘ও তুই পেলের জন্য ব্রাজিলকে সাপোর্ট করিস?’ বুড়োদার প্রশ্নের উত্তরে আমি কিছু বলার আগেই গোরাদা বলল, ‘পেলেকে তো লাজারোনি বলেছে শাট-আপ পেলে। সেই দলটাকে না কি আমাদের সমর্থন করতে হবে!’ লাজারোনি তখন ব্রাজিলের কোচ। কেন তিনি এ কথা বলেছিলেন, জানি না। বলাটা উচিত হয় নি অবশ্যই। কিন্তু স্বয়ং পেলে কি সেজন্য সেই বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে সাপোর্ট করেন নি? তাহলে আমি কেন করব না? কেন দেব না আর্জেন্টিনাকে অভিশাপ? আমার অভিশাপে কাজ হয়নি অবশ্য। তবে সেবার আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠলেও জেতে নি। বোধহয় কোনো তঞ্চকতা করে নি বলেই। জার্মানির কাছে হারে আন্দ্রে ব্রেমের করা গোলে। তবে গোরাদা ঐ ঘটনার পর অনেকদিন আমার সঙ্গে কথা বলে নি। কাজটা আমার অন্যায় ছিল সন্দেহ নেই। গোরাদা আমার চেয়ে অনেক বড় ছিল। কিন্তু তখন সদ্য কলেজে ঢুকেছি। আবেগ তখন মাত্রাছাড়া। তবে কাকিমা এই ঘটনাটা নিয়ে পরে খুব মজা করে বলত সবাইকে। বলতো, দুভায়ের কাণ্ড! একজন চেঁচিয়ে উঠল গোল বলে, আরেকজন দুম করে দরজা বন্ধ করে চলে গেল।
চলে গেছেন কাকিমা ২০১৮য়। গোরাদাও চলে গেল কাকিমার আগেই, অকালেই বলা চলে। আজও বিশ্বকাপ এলে গোরাদার কথাই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। আরও মনে পড়ে হাওড়ায় গোরাদাদের বাড়িতে বসে সবাই মিলে একসঙ্গে খেলা দেখার কথা। সে যে কী আনন্দের সময় ছিল। পাড়ারও কেউ কেউ আসত, যদিও তখন প্রায় সব বাড়িতেই টিভি এসে গেছে। গোরাদা আর আমার আবেগময় সমর্থন, চন্দনের মাঝে মাঝে টিপ্পনিকাটা মজার মজার কথা, কাকিমার মৃদু হাসি, কাকার সিগারেটের গন্ধ — সবই আজ কালের যবনিকার অন্তরালে চলে গেছে চিরকালের মতো। ১৯৯০-এর পরে আর কোনোদিন একসঙ্গে বিশ্বকাপ দেখা হয় নি। আমরা ৯২ সালে চলে আসি গড়িয়ায়। তারপর থেকে বিশ্বকাপ দেখি একাই।
আমার আশা পূরণ করে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতেছে দুবার, কোনো বিতর্ক ছাড়াই। আনন্দ পেয়েছি নিঃসন্দেহে, কিন্তু কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে গেছে। একা একা কি বিশ্বকাপ জেতার আনন্দ উপভোগ করা যায়? হাওড়ায় থাকলে সে আনন্দ পরিপূর্ণ হত অবশ্যই। তবু প্রতি চার বছর অন্তর বিশ্বকাপ আসে। রাত জেগে একা একা খেলা দেখায় বিরতি নেই। গড়িয়ায় আসার পর প্রথম দিকে বিশ্বকাপ দেখতে কোনো কোনো বন্ধুরা আসত। আজ তারা কেউ অনেক দূরে, শারীরিক বা মানসিকভাবে। কেউ আবার পৃথিবী ছাড়িয়েই চলে গেছে চিরকালের মতো। ছেলে মাঝে মাঝে দেখে বটে, তবে ও কম্পিউটারে যতটা আগ্রহী, ক্রিকেট ফুটবলে ততটা নয়। যুগ পাল্টে যায়। ও ব্রাজিলের সমর্থক, তবে আমার মতো আবেগ নেই। আমার আবেগও স্তিমিত, এখন যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। ব্রাজিলে আর তেমন অসামান্য ফুটবলার নেই। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে কেউ আসবেন মেসির মতো যিনি একক দক্ষতায় বিশ্বকাপ তুলে নেবেন। হয়তো এ জীবনে আর ব্রাজিলের জয় দেখব না। হয়তো এবারই জিতবে ষষ্ঠবার বিশ্বকাপ। জানি না কী হবে, শুধু জানি ব্রাজিল গ্রুপ লীগ থেকে ছিটকে গেলেও আমি ব্রাজিলই থাকব। যেমন ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হারের পরেও আছি। তবু যুক্তি দিয়ে ভাবার চেষ্টা করি কেন আমি ব্রাজিল সমর্থক। দেশটার সঙ্গে আমার কোনো সুদূর যোগাযোগ নেই। কোনোদিন ব্রাজিলে যাব তার কোনো অণুমাত্র সম্ভাবনা এখনও নেই। আমার কাছে ভারতের বাইরে সব দেশই সমান হওয়া উচিত। উচিত নিরপেক্ষ থাকা। তাহলে কেন? আমি পেলের শ্রেষ্ঠ সময়ের খেলা দেখি নি। মারাদোনার উত্থান দেখেছি। বিদায়ও। প্লাতিনিকে দেখেছি, দেখেছি জিদানের অপূর্ব খেলা। মেসি, রোনাল্ডোকে দেখে চলেছি। ব্রাজিলে এদের সমতুল্য এখনও কাউকে দেখি নি অল্পসময়ের রোনাল্ডিনহো ছাড়া। জিকো, সক্রেটিস, রোমারিও, রিভাল্ডো, রোনাল্ডো, কার্লোস অসাধারণ কিন্তু কখনোই মারাদোনা, জিদান ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো বা মেসি নন। নেইমারও সমসাময়িক দুজনের থেকে অনেক পিছিয়ে। তবু মাঠে হলুদ জার্সিকে দেখলেই রক্ত কেন যে আজও, এতো বয়সেও চনমন করে ওঠে কোনো যুক্তি দিয়েই তার ব্যাখ্যা পাই নি। ভালোবাসা বোধহয় কখনও যুক্তি মানে না। তাই ব্রাজিল ছাড়া অন্য কোনো দলকে সমর্থনের কথা ভাবতেও পারি না।
শুধু গতবার আর্জেন্টিনার একমাত্র কালিমাহীন বিশ্বকাপ জয়ের সময় আমি মনে মনে মেসির সমর্থক হয়ে গেছিলাম ফাইনালে। মেসি বিশ্বকাপ না পেলে সেটা হত বিশ্বকাপেরই অপূর্ণতা। যেমন অপূর্ণতা থেকে গেছে পুসকাস, ইউসেবিও, ক্রুয়েফ, জিকো বিশ্বকাপ না পাওয়ায়। যেমন অপূর্ণতা থেকে যাবে এবারও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো বিশ্বকাপ না পেলে। তাই গতবার মেসির জয় আনন্দ দিয়েছিল। গোরাদার কথা বড় মনে পড়ছিল মেসির হাতে বিশ্বকাপ দেখতে দেখতে।
লেখক পরিচিতি : শমিতকুমার দাস
জন্ম : হাওড়া জেলার হাওড়া শহরে। বর্তমান আস্তানা গড়িয়ায়। লেখালেখির শুরু স্কুলজীবনে। কবিতা দিয়ে শুরু। সেখান থেকে ছোটগল্প ও প্রবন্ধর দিকে যাওয়া। নেশা বলতে গান শোনা, নাটক দেখা। মাঝেমধ্যে আবৃত্তি বা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করলেও তা নিয়মিত নয়। আগ্রাসী পাঠক হলেও বই পড়া নেশা বা শখ নয়, কাজ। প্রকাশিত দুটি কাব্যগ্রন্থ-- 'এই যে আমার বিষাদগাথা', 'বিন্দুজল বাতাসে কাঁপে'।

