একদিনের গল্প

লেখক : প্রযুক্তিকা মিত্র

সত্যি কথা বলতে গেলে, দৈনন্দিন জীবনে প্রায় প্রত্যেক মানুষেরই এরকম বেশ কিছু অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে, যাকে কোন বিশেষ সারিতে ফেলা যায় না। তাই এই ধরণের গল্পগুলোকে ঠিক কী নামে ডাকা যায়, তা বুঝে উঠতে পারি না। তাই ভাবলাম, কোন নির্দিষ্ট নাম না দিয়ে বরং একদিনের কিছু বিশেষ মুহূর্ত আর ঘটনাপ্রবাহ আপনাদের সামনে তুলে ধরি।

দুধ স্নান

শুরু করি সকালের এক কাপ চা দিয়ে। সবার জন্য সব দায়িত্ব শেষ করে আমি এক কাপ চা আর দু’টো বিস্কুট নিয়ে বারান্দায় এসে বসলাম। চারদিকটা বেশ শান্ত। হালকা বাতাস, নরম রোদ—মনটাও কেমন ফুরফুরে হয়ে উঠল। চা শেষ করে হালকা গুনগুন করতে করতে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই—

টিং টং! কলিং বেলটা বেজে উঠল। এত সকালে আবার কে এল?

দরজা খুলেই আমি একেবারে থমকে গেলাম। দেখি, আমাদের পাড়ার এক কাকু দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু তাঁর অবস্থা দেখে আমার চোখ একেবারে বিস্ফারিত! আমি এক হাতে চায়ের কাপ, অন্য হাতে দরজার কড়া ধরে কিছুক্ষণ বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কাকু, এই কী অবস্থা আপনার? এমন হঠাৎ… কিছু হয়েছে?”
কাকু ততক্ষণে খানিকটা বিরক্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মা, তুমি কি কিছুই জানো না?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “না তো! কী হয়েছে বলুন?”
কাকু একটু গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি রোজ সকালে দুধ শিবলিঙ্গে চড়াও? না কি অন্য কোন পুজো করো?”
আমি তো একেবারে হতভম্ব! কাকু তখন ধীরে ধীরে রহস্যের পর্দা তুললেন, “তাহলে বলো তো, তোমার বারান্দা থেকে রোজ কার উদ্দেশ্যে দুধ ফেলা হয়?”
এইবার যেন আমার তৃতীয় নয়ন একেবারে উন্মুক্ত হ’ল। আমি একটু অস্বস্তি নিয়ে কাকুকে বললাম,“আপনি একটু বিস্তারিত বলুন তো…”
কাকু বললেন, “আমি রোজ সকাল সাতটায় বাজারে যাই। আর প্রতিদিনই দেখি, তোমাদের বারান্দার ঠিক নিচে সাদা কিছু একটা পড়ে থাকে। প্রথমে ভেবেছিলাম, তুমি হয়ত কোন পূজা-অর্চনা করো—প্রকৃতির উদ্দেশ্যে কিছু অর্পণ করছ।” কাকু এবার মাথার দিকে ইশারা করে বললেন, “কিন্তু আজ বুঝলাম, সেটা কোন দৈব ব্যাপার নয়! আজ সেই ‘অর্পণ’ সরাসরি আমার মাথায় এসে পড়েছে!”
আমি আর নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না, তবুও গম্ভীর মুখ রাখার চেষ্টা করছিলাম। কাকু বলতে থাকলেন, “আমি আজ করবী গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ফুল তুলছিলাম—তোমার কাকিমার পুজোর জন্য। আর ঠিক তখনই… উপর থেকে ঝপাস করে পুরো দুধটা আমার মাথায়!”

এবার সব পরিষ্কার। আমার সুপুত্রকে আমি যে রোজ সকালে এক গ্লাস করে ঘন কমপ্লেনের দুধ দিই, সে সেটাকে নিষ্ঠার সাথে “প্রকৃতির উদ্দেশ্যে অর্পণ” করে আসছে! আজ শুধু একটু ভুল হয়ে গেছে, কাকু সেই “প্রকৃতি”-র জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি লজ্জা, হাসি আর বিস্ময়ের মাঝামাঝি এক অদ্ভুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইলাম। আর সেই কারণেই, সেদিনের একেবারে শান্ত, সুন্দর সকালের “সুখপ্রভাত”-টা রামায়ণের সপ্তকাণ্ডের মত বিশাল না হ’লেও, সেদিন আমাদের বাড়িতে আমার আর পুত্রের মধ্যে যে এক ভয়ানক কাণ্ড ঘটেছিল, তা বোধহয় আপনাদের আর আলাদা করে না বললেও চলে!

মৎস্য পুরাণ

এই তো গেল সকালের কাণ্ড।

এরপর দিনের ক্রমপর্যায় অনুযায়ী আমি বেরোলাম বাজারে, সঙ্গে আমার সংসারের সহযোদ্ধা রিমা, যে মেয়েটি আমার সঙ্গে থাকে। তাকে ছাড়া আমার বাজারযাত্রা প্রায় অসম্পূর্ণ। সে আবার বাজারে গেলেই এমন আপ্লুত হয়ে পড়ে! মনে হয় না সে সবজি বাজারে এসেছে, মনে হয় যেন শাড়ি-গয়নার দোকানে ঢুকেছে! এক একটা সবজি হাতে তুলে নিয়ে সে এমনভাবে বর্ণনা করে, যেন সেগুলো কোন শিল্পকর্ম—“দিদি, এই পালং শাকটা দেখো না—কী টাটকা!” “দিদি, এই লাল শাকটা দেখো—একেবারে ফুলের মত কচি… ঠিক গোলাপের পাপড়ির মত!” আমি যতই বলি, “একদিনে দু’-তিন রকম শাক কিনে আমি করবটা কী?” কিন্তু না, তার উৎসাহের কোন শেষ নেই। শেষমেশ তার কথাতেই রাজি হয়ে যাই। একটার পর একটা শাক ব্যাগে ঢুকতে থাকে, আর আমি মনে মনে ভাবি— বোধহয় গোটা সপ্তাহ শাক দিয়েই কাটাতে হবে!

যাই হোক, শাক-সবজি পর্ব মিটল। এবার মৎস্য অধ্যায়। আমি সপ্তাহে একদিনই বাজার করি। বহুদিন ধরে একটা ইচ্ছা ছিল—একটু কই মাছ ধনেপাতা দিয়ে মাখামাখা ঝাল খাব। তাই পৌঁছে গেলাম আমি, মৎস্যপুরাণের দ্বারে! দরদাম করে বেশ ভালই কই মাছ নিলাম। কিন্তু একটা বড় ভুল করে ফেলেছিলাম, জ্যান্ত কই নিয়ে! লোভ—সে বড় সাংঘাতিক জিনিস! সব বাজার সেরে, শাক-সবজি, মাছ, মাংস নিয়ে আমরা দু’জন বীরদর্পে বীরঙ্গনা হয়ে ফিরছি! রিমা জ্যান্ত কই মাছের থলিটা এমনভাবে দোলাচ্ছে, যেন ওটা কোন ট্রফি! আমি যত মানা করি, সে ততই করে! আর ঠিক তখনই, যা হওয়ার তাই হ’ল! হঠাৎ—ঝপাস! ঝপাস! দুটি জ্যান্ত কই মাছ ব্যাগ থেকে লাফ দিয়ে সোজা রাস্তায়! তারপর শুরু হ’ল তিরিং তিরিং করে ডাঙায় হাঁটার লাইভ শো! একটা মাছ সোজা গিয়ে ঢুকল এক কলাওয়ালার ঠেলার নিচে। আরেকটা এমনভাবে লাফাতে লাগল, যেন সে জগিং করছে! রিমা একদিকে ছুটল, আমি আরেকদিকে! আমার এক হাতে সবজি, আরেক হাতে ব্যাগ, তার মধ্যেই আমি হয়ে গেলাম একেবারে গোয়েন্দা! চিৎকার করে উঠলাম, “আমার মাছ! আমার মাছ পালাচ্ছে! ধরো!” লোকজন চারিদিকে ছোটাছুটি শুরু করেছে, কে আগে বাগে আনবে। এদিকে রীমা সেই মাছ ধরতে গিয়ে বাকি মাছের থলিটাই মাটিতে নামিয়ে দিল! ফলাফল? বাকি মাছগুলোও একে একে, স্বাধীনতার ঘোষণা করে রাস্তায় নেমে পড়ল! শেষমেশ পাঁচটা মাছ উদ্ধার হ’ল, কিন্তু একটা মাছ নিখোঁজ! অবশেষে দেখা গেল, মাছটি কলাওয়ালার ঠেলার নিচে ঝুড়ির মধ্যে ঢুকে সে তার বীরত্ব দেখিয়েছে! বাধ্য হয়ে সেই “যুদ্ধবিদ্ধস্ত” কলাগুলোও কিনে নিতে হ’ল।

এইসব সামলে যখন আবার ফিরছি, হাতে মাছ, ব্যাগে কলা…ঠিক তখনই!! একটা ছাগল—মাংসের দোকানের সামনে বাঁধা ছিল। সুযোগ পেয়ে সে আমার ব্যাগে মুখ ঢুকিয়ে, কচি লাল শাক, পালং শাক—সব চর্বিতচর্বণ! এমনকি পটলগুলোও ছাড়েনি! আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছি, সে দিব্যি শান্তভাবে খেয়েই চলেছে!

শেষমেশ দাঁড়িয়ে ভাবলাম—আজ শুধু মাছ নয়, আমার টাকাও পটল তুলল!

ভৌতিক সম্মোহন

যাই হোক, সকালের মহাকাণ্ড, মৎস্যপুরাণ, আর ছাগল-পর্ব সামলে, ছাগলের মুখ থেকে ছিনিয়ে আনা লাল শাক, কই মাছের ঝাল,আর ছেলের জন্য ডিম পোস্ত রান্না করে আমি অবশেষে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। মনে মনে ভাবলাম,আজ একটু দিবানিদ্রা না নিলে আর চলবে না! সকাল থেকে যা যা কাণ্ড ঘটেছে, একটু শুয়ে পড়লে হয়ত সব ক্লান্তি কাটবে। আমি বিছানায় শুয়ে চোখটা মাত্র বুজেছি…ঠিক তখনই—

টিং টং! কলিং বেল!

আমি এক ঝটকায় উঠে বসলাম। মনেমনে বললাম, “আজ কি শান্তি বলে কিছু নেই?”
দরজা খুলে দেখি, একজন পীরবাবা গোছের লোক দাঁড়িয়ে। চোখে অদ্ভুত চাহনি, হাতে একটা থলে। উনি একনাগাড়ে বলে যাচ্ছেন, “মা… পীরবাবার আশীর্বাদে কিছু তো দাও…”
সেদিন সেই পীরবাবার ডাকে, আমি একবার-দু’বার নয়, তিনবার বাইরে গিয়েছিলাম। প্রতিবারই হাতে কিছু টাকা। আমার নিজের উপর যেন তখন আর আমার কোন নিয়ন্ত্রণই ছিল না।

ঠিক তখনই, এসে পড়ল, আমার সেই সহযোদ্ধা, যে বাজারের মাঠে মাছের পেছনে দৌড়ায়—সেই রিমা।
সে অবাক হয়ে বলল, “তুমি কার সাথে কথা বলছ?”
আমি যেন স্বাভাবিক গলায় বললাম, “একজন পীরবাবা এসেছে… উনি জল চাইছেন… আমাকে একটা তাবিজ আর পাথর দিলেন…”

রিমার চোখের চাহনি এক মুহূর্তে বদলে গেল। সে আর একটাও কথা না বলে, দৌড়ে দরজার দিকে গেল। তারপর,ধড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল বাথরুমে। শাওয়ারটা খুলে দিল—সরাসরি আমার মাথার উপর! ঠাণ্ডা জলের ধারা… হঠাৎ পুরো শরীরটা কেঁপে উঠল। আমি ভিজে জামাকাপড়ে দাঁড়িয়ে—হতভম্ব, অসাড়। কিছুক্ষণ পরে যেন বোধ ফিরে এল।আমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “কী হ’ল রে?”
রিমা চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওখানে তো কেউ ছিলই না!”
আমার বুকটা হিম হয়ে গেল। আমি ধীরে ধীরে হাতের দিকে তাকালাম…সত্যিই—আমার হাতে তখনও ধরা ছিলএকটা সাদা পাথর… আর একটা তাবিজ।
তাহলে এটা কী ছিল? ভৌতিক? সম্মোহন? না কি কোন চতুর জালিয়াতির ফাঁদ? আমার বিজ্ঞানসম্মত মাথা কোন উত্তর খুঁজে পেল না।

শুধু একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছিল—সেদিন যদি রিমা না থাকত…আমি যদি আর একবার দরজা খুলতাম…তাহলে হয়ত সেই দিনটাই আমার জীবনের এক ভয়ংকর মোড় হয়ে উঠত।

সখা

আজও যখন একা বসে সেই দিনের কথা ভাবি, মনে হয়, দিনটা শুধু অদ্ভুত ছিল না… বরং একেবারে বর্ণময়। একই দিনে এত রকম ঘটনা,হাসি, ভয়, অস্বস্তি, বিস্ময়—সব মিলেমিশে যেন একটা রঙিন ফুলদানিতে সাজানো নানান রঙের ফুল। যেহেতু সেদিন আমার off-day ছিল,তাই আর কোন কাজ করিনি।ছেলে সব শুনে একটু চিন্তিত হয়ে পড়ল। আমি নীরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে, তারাদের দেখতে দেখতে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। মনে তখন সারাদিনের প্রতিটা মুহূর্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে…

রাতের দিকে আমার কর্তা বাড়ি ফিরলেন। তাকে সব খুলে বললাম—সকালের দুধকাণ্ড থেকে শুরু করে, মাছের মহাযুদ্ধ,ছাগলের আক্রমণ আর সেই পীরবাবার রহস্য—সব।
শুনে তিনি হেসে বললেন, “তুমি তো একেবারে ধন্যি গিন্নী!”
তারপর ছেলেকে ডেকে একটু মজার ছলে বললেন, “দুষ্টুমি হ’ল মহাবিদ্যা, যদি না পড় ধরা!”
কিন্তু তারপর তিনি আমার পাশে এসে শান্ত গলায় বললেন, “দেখো, মাঝে মাঝে মন যখন অস্থির থাকে, তখন আমরা না জেনেই অনেক কিছুর প্রভাবে পড়ে যাই।হয়ত আজ তোমার দিনটাই এমন ছিল।”

তার কথাগুলো শুনে মনে হ’ল, কেউ যেন আমার ভিতরের সব অস্থিরতাকে আলতো করে ছুঁয়ে দিল। তার সেই স্নেহ, সেই বোঝাপড়া, আমার মনটাকে ধীরে ধীরে শান্ত করে দিল। সেদিন আবার নতুন করে অনুভব করলাম, সে শুধু আমার স্বামী নয়… সে আমার ভরসা, সখা। সেদিনের সেই দিনটা—আমি যতদিন বেঁচে থাকব, সেই দিনের প্রতিটা মুহূর্ত আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করবে— কোহিনূরের মত উজ্জ্বল, একটি দিনের অগণিত রঙিন গল্প হয়ে।


লেখক পরিচিতি : প্রযুক্তিকা মিত্র
নতুন করে নিজের পরিচয় নেই, কলম এই আমার porichiti

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up