সুখের ঘরের চাবিকাঠি

লেখক: মিত্রা হাজরা

অফিসের গাড়ি যখন নামিয়ে দিয়ে গেল যশোধারাকে রাত এগারোটা প্রায় বেজে গেছে। নিশুতি পাড়া, মাঝে মাঝে দু-একটা সাইকেল আরোহী যাচ্ছে বটে, রাস্তার কুকুরটা মুখ তুলে দেখে আবার শুয়ে পড়লো, সে যশোধারাকে চেনে। প্রায়ই দেরি হয় — ফ্ল্যাটের দরজায় এসে চাবি ঘুরিয়ে ভিতরে এসে দেখলো, বাবার ঘরের আলো জ্বলছে। মানে আজ ও না খেয়ে বসে আছে। সোজা বাবার ঘরে ঢুকে
— আজও তুমি না খেয়ে বসে আছো!
— এই তো, তুমি এসে গেছ, দুজনে একসাথে খাবো।
— কিন্তু বেশি রাতে খেলে, তোমার যে শরীর খারাপ হবে বাবা !
— কিছু হবে না, তোমার ও তো রাত হচ্ছে, খিদে পেয়েছে নিশ্চয়। চলো, চলো মুখ হাত ধুয়ে নাও। খেতে বসে টুকটাক কথা বলে খাওয়া শেষ করে যশোধারা ।
সব গুছিয়ে বাবাকে ওষুধ, জল দিয়ে, দেখলো বাবা শুতে চলে গেল। নিজের ঘরে এসে আয়নার সামনে বসে মুখে ক্রিম ঘষলো, চুলটা আচঁড়ে বেঁধে নিল, তারপর ব্যালকনিতে এসে চেয়ার টেনে বসলো। এটা তার নিজের সময়, নিজেকে নিয়ে ভাবার সময়। যখন মানব এখানে ছিল — দুজনে বসতো এসে, একটু পরে মানব উঠে গেলেও ও বসে থাকতো। সেটা কতদিন আগে! আজকাল মাস বছর সব যেন কেমন গুলিয়ে যায়। সেই তো একই ঝিমঝিমে রাত আছে, আকাশ তারাভরা ,তবু যেন কত আলাদা।

শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলো। আজ মহুয়া ঠারে ঠোরে যা বললো — ঋষভ নাকি ওকে ভালোবাসে, বিয়ে করতে চায়! ঋষভের চোখে মুখেও একটা মুগ্ধতা দেখে — যদিও তাকে আমল দেয় না ধারা। আজ পেঁয়াজের খোসার মতো অতীতটাকে খুলে দেখতে পায় সে। পরতে পরতে জমে আছে কত স্মৃতি, কত স্বপ্ন। ছোটবেলাটা খুব হাতড়াতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে। বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে হৈহৈ আড্ডা। কত স্বপ্ন তখন চোখে, একটু একটু করে স্বপ্নগুলো সত্যি তো হচ্ছিল। আর বিয়ের পরের কিছু ভালোলাগার মুহূর্ত। সেগুলো কি মিথ্যা ছিল! জানে না যশোধারা।

সমস্যা… তা তো থাকবেই, সেই সমস্যাকে অতিক্রম করাই তো জীবন। যা এই চার বছর ধরে করে চলেছে যশোধারা। বিয়ের তিন বছর যেতে না যেতেই বিচ্ছেদ। ভেবেছিল জীবনটাই বোধহয় শেষ হয়ে গেল। না হয়নি… মানব তার জীবন থেকে চলে গেছে, ঘর বেঁধেছে বিদেশে গিয়ে। ভাগ্যে সে চাকরিটা পেয়েছিল নিজের চেষ্টায়! আবার নতুন করে ভাবা, অসম্ভব! এই
ভালো।

রাতে ঘুমটা ভালো করে হলো না। ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্ন — কে যেন এসেছে মানব নাকি ঋষভ! সকালে উঠে দেখলো বৃষ্টি ঝরছে অঝোরে, তাড়াতাড়ি ব্রাশ করে মুখ হাত ধুয়ে রান্নাঘরে এসে চা করলো দুকাপ, বাবা উঠে যায় সকাল সকাল, আজ কি দেরি হয়ে গেল! চা নিয়ে বাবার ঘরে এলো
— বাবা তোমার চা।
— চা এনেছো! দাও বৌমা, খুব বৃষ্টি পড়ছে। আজ তোমার অফিসও তো আছে।
— হ্যাঁ বাবা, যাবো তবে দেরি করে যাবো। দেখ আজ আবার নীলা আসে কি!
নীলাদিকে ভাগ্যে পাওয়া গেছে, নাহলে কি হতো কে জানে, রান্নাবাড়া করে বাবাকে খাইয়ে, রাতের রান্না করে বাড়ি যায়। বলতে বলতেই নীলাদি ঢোকে
—বাবা কি বৃষ্টি, কি বৃষ্টি! তোমরা কি খাবে গো আজকে, খিচুড়ি করি!

বাবা ছেলেমানুষ এর মতো খুশি হয়ে গেল — করবি নীলা! তবে দুটো কড়কড়ে করে আলুভাজ, আর বড়ি ভাজা কর—।
হাসতে হাসতে নীলাদি হাত পা ধুয়ে রান্নাঘরে ঢোকে—হেঁকে বলে চা খাবে নাকি আর একবার।
— হ্যাঁ, করো তবে নীলাদি, একটু আদা দিও তো চায়ে।
নিজের ঘরে এসে টেবিলে ডাইরিটা দেখতে পেল, খোলা ছিল। কাল কবিতা লিখছিল একটা।
“বৃষ্টি ভেজা একটা শহর/হৃদয় জুড়ে জলের ঝাপট
মেঘমল্লার দাপাদাপি/বর্ষাতি আর ছাতার ভিড়ে
জলরঙা এক ছবি যেন।
কদম্বরেণু পথের পরে/পোড়ার জ্বালায় নরম মলম
মন কি কাঙাল!
আলিঙ্গনে দুহাত বাড়ায়
ছলকায় তার সুখের চাবি।”
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নিমগাছটার দিকে চোখ গেল যশোধারার। একটা ছোট পাখি, গাছের ডালে তুড়ুক তুড়ুক করে লাফাচ্ছে। পোকা কি! কী যেন খুঁটে খাচ্ছে। পিঠটা তেল চুকচুকে কালো, দুপাশে সাদা দাগ লেজ পর্যন্ত গেছে, ওটা কি দোয়েল, আবার শিষ দিচ্ছে। ঘরে চলে এলো, ভালো লাগছে না অফিস যেতে আজ, মোবাইলে ধরলো তনিমাদিকে — “দি আজ যাবো না অফিস।”
— কেন
— শরীর খারাপ, না কাল রাত হয়েছে, আবার ঘুমটাও হয়নি ভালো।
— ঠিক আছে…রেস্ট নাও।
বাবার ঘরে চলে এলো ধারা। সোফায় বসে বললো
— বাবা ছুটি নিলাম, আজ বেরুবো না। খুশিতে হাসলো বাবা, “বাহ্ চমৎকার, দুজনে গল্প করবো অনেক, বৌমা কাল একটা চিঠি এসেছে, চিঠি!”
— কার চিঠি বাবা?
— তোমার মায়ের, মায়ের!
— কী লিখেছে মা!
— যে কথা আগেও বলেছেন— তোমার নতুন করে সংসার করার কথা। উনি তোমার মা, মেয়ের ভালো তো চাইবেন সব মাই। তুমি ভাবো আবার, আমার বয়স হচ্ছে, আমি আর ক’দিন!
না বা—বা, ওকথা বোলোনা, খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি, এখানে এসে তোমাকে পেলাম, আর হারাতে চাই না।
— কিন্তু আমার ছেলেই তো সব কিছু ছেড়ে আমায় ছেড়ে চলে গেল…শুধু শুধু তুমি জড়িয়ে নিয়ে…
বলতে বলতে গলা বুজে এলো হিরন্ময়বাবুর। পাশে এসে হাত দুটো জড়িয়ে বললো
— বেড়াতে যাবে বাবা…চলো না, পাহাড়, সমুদ্র যেখানে হোক… অনেকদিন আমরা কোথাও যাই নি।

চোখ মুছলেন হিরন্ময় বাবু।
— যাবে চলো তবে… ‘স্নেহ’-তে যাই, দার্জিলিং-এ। ওরাও প্রায়ই ফোন করে লেখে। ঐ অনাথালয়ে শুধু টাকাটাই পাঠাই, যাওয়া হয়নি।
— তা বেশ তো বাবা… আমি ফোন করে দেবো। ক’দিন ছুটি নিয়ে চলো ঘুরে আসি, বাচ্চাদের মাঝে ভালো লাগবে। আর কী কী নিয়ে যাওয়া হবে বাচ্চাদের জন্য লিস্ট করতো বাবা, আমি কিনে আনবো।” বাবা-মেয়েতে যুক্তি আলোচনা চলতে লাগলো।

“স্মৃতি কি ভাসায়, ডোবায়, নাকি
ছিঁড়ে পড়ে বালুচরে।
উতাল পাতাল জোয়ারে, মন গহীন সাগরে দেয় ডুব
আনন্দের অন্বেষণে, ঈপ্সা সদা জাগ্রত।
বেঁচে ওঠে চেতনায়, মননে
পাওয়া যায় অসীমে, অনন্তে।”

লেখকের কথা: মিত্রা হাজরা
আমি মিত্রা, লেখালেখি করতে ভালোবাসি, কবিতা, ছোটগল্প লিখি মাঝে মাঝে। বই পড়তে ও গান শুনতে ভালোবাসি। পড়ি শংকর এর লেখা, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা, আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প আমার খুব প্রিয়। জীবনানন্দ দাশ, রুদ্রমুহম্মদ শহিদুল্লা, সুনীল, বিষ্ণু দে এর কবিতা পড়তে ভালোবসি । আমার লেখা পড়ে আপনাদের ভালো লাগলে বা খারাপ লাগলে অবশ্যই জানাবেন।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।