লেখক : অজয় কুমার দে
গৌরকান্তিঃ স্বয়ং কৃষ্ণো রাধাভাবরসাপ্লুতঃ।
শ্রীরাধা গদাধরো ভূত্বা গৌরসঙ্গং ভজত্যনিশম্॥
একাত্মানৌ দ্বিরূপৌ তৌ প্রেমরসস্বরূপিণৌ।
বন্দে গৌরগদাধরৌ নিত্যং ভক্তাভীষ্টপ্রদায়কৌ॥
১. ছন্দ ও অক্ষরমাত্রা যাচাই (প্রতি চরণে নিখুঁত ৮ অক্ষর)
শ্লোকটি অনুষ্টুপ্ (বা শ্লোক) ছন্দে রচিত। নিয়ম অনুসারে প্রতি চরণে ঠিক ৮টি করে অক্ষর (Syllable) বিদ্যমান:
প্রথম শ্লোক:
চরণ ১: গৌ-র-কান্-তিঃ স্ব-য়ং কৃষ্-ণো = ৮ অক্ষর
চরণ ২: রা-ধা-ভা-ব-র-সা-প্লু-তঃ = ৮ অক্ষর
চরণ ৩: শ্রী-রা-ধা গ-দা-ধ-রো ভূ-ত্বা = ৮ অক্ষর
চরণ ৪: গৌ-র-সং-গং ভ-জ-ত্য-নি-শম্ = ৮ অক্ষর
দ্বিতীয় শ্লোক:
চরণ ১: এ-কাৎ-মা-নৌ দ্বি-রূপৌ তৌ = ৮ অক্ষর
চরণ ২: প্রে-ম-র-স-স্ব-রূপি-ণৌ = ৮ অক্ষর (অনুষ্টুপ্ নিয়ম অনুসারে ১ম ও ৩য় চরণের ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম বর্ণ লঘু-গুরু-লঘু: ‘স-রূপি’ = ১-২-১)
চরণ ৩: বন্-দে গৌ-র-গ-দা-ধ-রৌ = ৮ অক্ষর
চরণ ৪: নিৎ-যং ভক্-তা-ভীশ্-ট-প্র-দা-য-কৌ = ৮ অক্ষর
২. বিশুদ্ধ সংস্কৃত অন্বয়
(যঃ) স্বয়ং কৃষ্ণঃ রাধাভাবরসাপ্লুতঃ (সন্) গৌরকান্তিঃ (ভবতি),
(যা) শ্রীরাধা গদাধরঃ ভূত্বা অনিশং গৌরসঙ্গং ভজতি।
একাত্মানৌ দ্বিরূপৌ প্রেমরসস্বরূপিণৌ তৌ,
ভক্তাভীষ্টপ্রদায়কৌ গৌরগদাধরৌ (অহং) নিত্যং বন্দে॥
৩. বিশুদ্ধ শ্লোকের অনুবাদ
স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধার পরম প্রেমভাব ও রসে প্লাবিত হয়ে উজ্জ্বল গৌরকান্তি ধারণ করেছেন। আর স্বয়ং শ্রীরাধা শ্রীগদাধর পণ্ডিত রূপ পরিগ্রহ করে অহোরাত্র (নিরন্তর) শ্রীগৌরাঙ্গের সঙ্গ ও সেবা ভজন করছেন। যাঁরা মূলে অভিন্ন এক পরমাত্মা হলেও লীলারস আস্বাদনার্থে দুটি বিগ্রহে প্রকট হয়েছেন এবং সাক্ষাৎ প্রেমরসেরই স্বরূপ—ভক্তগণের মনোবাঞ্ছা ও পরম অভীষ্ট প্রদানকারী সেই শ্রীগৌর-গদাধর যুগলকে আমি নিত্য বন্দনা নিবেদন করি।
৪. চরণভিত্তিক গভীর তাত্ত্বিক ও ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ
প্রথম চরণ: গৌরকান্তিঃ স্বয়ং কৃষ্ণো রাধাভাবরসাপ্লুতঃ
ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ:
গৌরকান্তিঃ — গৌরবর্ণা কান্তিঃ যস্য সঃ (বহুব্রীহি সমাস), প্রথমার একবচন।
স্বয়ংকৃষ্ণো — স্বয়ং কৃষ্ণঃ (এর পর ঘোষ বর্ণ থাকায় সন্ধির নিয়মে ও-কার হয়েছে)।
রাধাভাবরসাপ্লুতঃ — রাধায়াঃ ভাবঃ = রাধাভাবঃ (ষষ্ঠী তৎপুরুষ); রাধাভাবস্য রসঃ = রাধাভাবরসঃ (ষষ্ঠী তৎপুরুষ); তেন আপ্লুতঃ (তৃতীয়া তৎপুরুষ)।
বিশেষণ পদসঙ্গতি: ‘গৌরকান্তিঃ’, ‘কৃষ্ণঃ’ এবং ‘রসাপ্লুতঃ’ পদত্রয়ই পুংলিঙ্গে প্রথমা বিভক্তির একবচনে অবস্থান করায় ব্যাকরণগত সঙ্গতি নিখুঁত।
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের মূল ভিত্তি হলো শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কেবল অবতার নন, তিনি ‘স্বয়ং ভগবান’ শ্রীকৃষ্ণ। তবে এই প্রকাটে তিনি শ্রীরাধার ভাব (প্রেমাবেশ) এবং কান্তি (অঙ্গচ্ছটা) দ্বারা নিজেকে প্লাবিত (রসাপ্লুত) করে গৌরাঙ্গ রূপ ধারণ করেছেন।
দ্বিতীয় চরণ: শ্রীরাধা গদাধরো ভূত্বা গৌরসঙ্গং ভজত্যনিশম্
ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ:
শ্রীরাধা — প্রথমার একবচন (কর্তাপদ)।
গদাধরঃ — গদাং ধরতি ইতি (উপপদ তৎপুরুষ সমাস), এখানে সন্ধির নিয়মে ‘গদাধরো’।
ভূত্বা — ভূ ধাতু + ক্ত্বা প্রত্যয় (অসমাপিকা ক্রিয়া = হয়ে)।
ভজত্যনিশম্ — ভজতি + অনিশম্ (যণ্ সন্ধি: ই + অ = য্)। ‘ভজতি’ হলো লট্ লকারের ১ম পুরুষ (৩য় ব্যক্তি) একবচন, যা কর্তাপদ ‘শ্রীরাধা’র সাথে ব্যাকরণসিদ্ধ। ‘অনিশম্’ হলো ক্রিয়াবিশেষণ অব্যয় পদ (অর্থ: নিরন্তর)।
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি স্বয়ম্ভূ শ্রীরাধা গৌরলীলায় শ্রীগদাধর পণ্ডিত রূপে অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি মহাপ্রভুর ছায়ার ন্যায় অবস্থান করে নিরন্তর (অনিশম্) গৌরসঙ্গ ভজন করছেন এবং অন্তরঙ্গ সেবার মাধ্যমে প্রেমরস আস্বাদন করাচ্ছেন।
তৃতীয় চরণ: একাত্মানৌ দ্বিরূপৌ তৌ প্রেমরসস্বরূপিণৌ
ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ:
দ্বিবচন প্রয়োগ: গৌর ও গদাধর—উভয় বিগ্রহকে একসঙ্গে নির্দেশ করার জন্য প্রতিটি পদ প্রথমা বিভক্তির দ্বিবচনে গঠিত।
একাত্মানৌ — একঃ আত্মা যথোঃ তৌ (বহুব্রীহি সমাস, প্রথমার দ্বিবচনে ‘একাত্মানৌ’)।
দ্বিরূপৌ — দ্বে রূপে যয়োঃ তৌ (বহুব্রীহি সমাস, প্রথমার দ্বিবচন)।
প্রেমরসস্বরূপিণৌ — প্রেমরসে স্বরূপৌ অস্য ইত্যর্থে ‘ইন্’ প্রত্যয়ান্ত ‘স্বরূপিন্’ শব্দের প্রথমার দ্বিবচনে ‘প্রেমরসস্বরূপিণৌ’।
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: স্বরূপ দামোদর গোস্বামীর বিখ্যাত সিদ্ধান্ত—“একাত্মানাবপি ভুবি পুরা দেহভেদং গতৌ তৌ”—এর রূপায়ণ এটি। গৌর এবং গদাধর তাত্ত্বিকভাবে একই পরমাত্মা, কিন্তু প্রেমরসের বিচিত্র আস্বাদন ও বিতরণের উদ্দেশ্যে দুটি ভিন্ন রূপ গ্রহণ করেছেন।
চতুর্থ চরণ: বন্দে গৌরগদাধরৌ নিত্যং ভক্তাভীষ্টপ্রদায়কৌ
ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ:
বন্দে — বন্দ্ ধাতু + লট্ লকার (আত্মনেপদ), উত্তম পুরুষ, একবচন (অর্থ: আমি বন্দনা করি)।
গৌরগদাধরৌ — গৌরশ্চ গদাধরশ্চ (দ্বন্দ্ব সমাস)। ‘বন্দে’ ক্রিয়াপদের কর্মপদ হওয়ায় দ্বিবচনে দ্বিতীয়া বিভক্তি যুক্ত হয়েছে।
ভক্তাভীষ্টপ্রদায়কৌ — ভক্তানাম্ অভীষ্টম্ (ষষ্ঠী তৎপুরুষ) ➔ তৎ প্রদাতঃ ইতি (উপপদ সমাস)। এটি ‘গৌরগদাধরৌ’ পদের বিশেষণ হওয়ায় দ্বিতীয়া বিভক্তির দ্বিবচনে রূপায়িত।
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: শ্রীগৌর-গদাধর যুগলরূপ পরম কৃপাময়। ভক্তগণের পরম অভীষ্ট যে বিশুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেম, তা প্রদানকারী এই অভেদ যুগলবিগ্রহের শ্রীচরণে অনুগত সাধক নিত্য বন্দনা নিবেদন করছেন।
লেখক পরিচিতি : অজয় কুমার দে
অজয় কুমার দে (সাহিত্যিক নাম: প্রণবনন্দন) একজন ভারতীয় বাঙালি কবি, গবেষক ও রসায়নবিদ। তিনি ১৯৯২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সাটুই অঞ্চলের পোড়াডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বিজ্ঞানভিত্তিক পেশা এবং আধ্যাত্মিক সাহিত্যের সুষম সমন্বয়ে তাঁর জীবন ও কর্মধারা বিকশিত। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ শ্রীপাট সিংহ কলেজ থেকে রসায়নবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি পেশাগত জীবনে দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে জ্যেষ্ঠ কারিগরি বিশেষজ্ঞ ও রসায়নবিদ হিসেবে যুক্ত হন। পাশাপাশি তিনি তথ্যপ্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং সাইবার অপরাধ তদন্ত বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। সাহিত্যজগতে 'প্রণবানন্দন' ছদ্মনামে পরিচিত এই লেখক মূলত গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন, শ্রীগদাধর পণ্ডিত গোস্বামীর তাত্ত্বিক অবদান এবং মধ্যযুগীয় বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে গভীর মৌলিক গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তাঁর রচিত বেশ কিছু গবেষণা নিবন্ধ ও শাস্ত্রীয় কাব্য রূপায়ণে বৈষ্ণব দর্শনের সূক্ষ্ম ব্যাকরণ ও অনুষ্টুপ ছন্দের নিখুঁত মেলবন্ধন দেখা যায়। সাহিত্য ও আঞ্চলিক গবেষণায় তাঁর নিরলস অবদানের জন্য তিনি 'নজরুল পুরস্কার'-এ ভূষিত হয়েছেন।

