লেখক : অর্দ্ধেন্দু গায়েন
বাংলার নদীমাতৃক ভূখণ্ডে উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা এবং বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার সীমান্ত জুড়ে প্রবহমান এক অন্যতম মহিমান্বিত নদী ‘রায়মঙ্গল’। এটি কেবল একটি জলধারা নয়, বরং ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবনের এক প্রধান ধমনী। একদিকে এর উত্তাল ও ক্ষিপ্র রূপ যেমন মানুষের মনে ভীতি জাগায়, অন্যদিকে এর শান্ত ও অকৃপণ দান সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র এবং স্থানীয় লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকাকে টিকিয়ে রেখেছে। ভারত ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমানা নির্ধারণকারী এই নদীটি দুই দেশের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের এক অনন্য প্রতীক।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সুন্দরবন অঞ্চলে কালিন্দী নদীর দক্ষিণ-পূর্ব শাখা থেকে রায়মঙ্গল নদীর উৎপত্তি। এটি মূলত ইছামতি-কালিন্দী নদীরই একটি বিস্তৃত অংশ, যা সুন্দরবনের হিঙ্গলগঞ্জের কাছ থেকে জলধারায় বিভক্ত হয়ে রায়মঙ্গল নাম ধারণ করেছে। আবার অনেকে মনে করেন, ইছামতি নদী কালিন্দী নামে দক্ষিণে প্রবাহিত হওয়ার পর, কালিন্দী ও কুদালিয়া নদীর জলধারা একত্রিত হয়ে রায়মঙ্গল নদীর সৃষ্টি করেছে। নদীটি বিশাল চওড়া বুক নিয়ে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অবশেষে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। নদীটির একপাশে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ (হিঙ্গলগঞ্জ ও গোসাবা ব্লক) এবং অন্যপাশে বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা জেলা (শ্যামনগর উপজেলা)। সুন্দরবনের অন্যান্য জোয়ার-ভাটা চালিত নদীর মতই রায়মঙ্গলের জল অত্যন্ত লবণাক্ত।
রায়মঙ্গল নদী তার ভয়াল ও ক্ষিপ্র রূপের জন্য সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় পরিচিত। এটি কোন সাধারণ শান্ত নদী নয়, বরং সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার তীব্র স্পন্দনে এটি প্রতিনিয়ত আলোড়িত হয়। প্রতিদিন দু’বার জোয়ারের সময় সমুদ্রের জল যখন প্রবল বেগে রায়মঙ্গলে প্রবেশ করে, তখন নদীর রূপ বদলে যায়। জলের উচ্চতা এক ধাক্কায় অনেকখানি বেড়ে যায় এবং নদী ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। আয়লা, আমফান, ইয়াস বা রেমালের মত বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের সময় রায়মঙ্গল নদী রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছিল। সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস যখন নদীর ক্ষিপ্র স্রোতের সাথে মেশে, তখন নদীর বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। নদীর এই ক্ষিপ্রতা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শত শত গ্রামকে জলের তলায় তলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এই নদীর তীব্র স্রোত ও ঘূর্ণির কারণে প্রতিনিয়ত এর দুই পাড়ে ভয়াবহ ভাঙন দেখা যায়। বিঘার পর বিঘা কৃষিজমি, মানুষের ঘরবাড়ি এবং সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের একাংশ এই ক্ষিপ্র নদীর পেটে চলে যায়।
১. সমৃদ্ধ মৎস্যভাণ্ডার ও জীবিকা
নদীটির নোনা জল বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও কাঁকড়ার আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্র। স্থানীয় হাজার হাজার ‘মৎস্যজীবী’ ও ‘বাওয়ালী’ (যারা সুন্দরবনের সম্পদ সংগ্রহ করে) এই নদীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। রায়মঙ্গলের বাগদা চিংড়ির মীন (পোনা) সংগ্রহ করে এই অঞ্চলের অর্থনীতি সচল থাকে। এছাড়া ভেটকি, পার্শে, ভাঙাল মাছ এবং বিশ্বখ্যাত ইলিশ মাছও এই নদীতে পাওয়া যায়।
২. ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের পুষ্টি যোগান
সুন্দরবনের বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ অরণ্যের (সুন্দরী, গেঁওয়া, গরান ইত্যাদি) বেঁচে থাকার জন্য যে বিশেষ ধরণের কাদা ও পুষ্টির প্রয়োজন হয়, তা রায়মঙ্গলের জোয়ারের জলই বহন করে আনে। নদীর বয়ে আনা পলি ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের শ্বাসমূলকে পুষ্ট করে, যা পরোক্ষভাবে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণসহ সুন্দরবনের সমস্ত বন্যপ্রাণীর জীবনচক্র সচল রাখে।
৩. আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও যোগাযোগ
ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত নদী হওয়ায় রায়মঙ্গল আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই নদী দিয়ে দুই দেশের মধ্যে পণ্যবাহী কার্গো জাহাজ যাতায়াত করে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে মজবুত রাখতে ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া, দুর্গম সুন্দরবনে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম এই জলপথ।
সময়ের সাথে সাথে মানুষের হস্তক্ষেপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে রায়মঙ্গল নদী আজ এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে নদীর বুকে বিভিন্ন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে, যার ফলে রায়মঙ্গলের জলে লবণাক্ততা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। এর ফলে নদীর মিষ্টি জলের মাছ কমে যাচ্ছে এবং নদীর পাড়ের কৃষিজমিতে নোনা জল ঢুকে চাষাবাদের ব্যাপক ক্ষতি করছে। উজানের নদীগুলো থেকে মিষ্টি জলের প্রবাহ কমে যাওয়ায় রায়মঙ্গলের তলদেশে দ্রুত পলি জমছে। ফলস্বরূপ, নদীর গভীরতা বা নাব্যতা কমে যাচ্ছে। নাব্যতা কমে যাওয়ার কারণে জোয়ারের জল নদী ধারণ করতে পারে না, ফলে সামান্য বৃষ্টি বা জোয়ারেই নদীর জল উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। তাছাড়া পর্যটন ব্যবসার প্রসার এবং নদী তীরবর্তী মানুষের অসচেতনতার কারণে রায়মঙ্গলের জলে প্লাস্টিক ও বর্জ্য পদার্থ মিশছে। সর্বোপরি, মাছের ভেড়িগুলো থেকে নির্গত রাসায়নিক নদীর জলকে দূষিত করছে, যা জলজ প্রাণীদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলছে।
বর্তমানে নদীর ভাঙন রুখতে সরকার বিভিন্ন জায়গায় কংক্রিটের ও জিও-ব্যাগ যুক্ত আধুনিক বাঁধ নির্মাণ করছে। তবে নদীর ক্ষিপ্রতার কাছে অনেক সময় এই কৃত্রিম বাঁধও টিকতে পারছে না। যদি কোনদিন রায়মঙ্গল নদী শুকিয়ে যায় বা এর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়, তবে তা সুন্দরবন এবং সমগ্র উত্তর এবং দক্ষিণবঙ্গের জন্য এক মহাপ্রলয় ডেকে আনবে।
সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা রায়মঙ্গল নদী এবং তার তীরবর্তী মানুষের জীবনসংগ্রাম একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উত্তর ২৪ পরগণার হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকের যোগেশগঞ্জ অঞ্চলের মাধবকাটী গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব শম্ভু চরণ গায়েন মহাশয়ের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে রায়মঙ্গল নদী সম্পর্কে যে বাস্তব চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা নিচে তুলে ধরা হ’ল:
শম্ভু বাবু তাঁর অভিজ্ঞতায় উল্লেখ করেন যে, “রায়মঙ্গল নদী কেবল একরাশ জলধারা নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।” তিনি বলেন, “গ্রামের বহু মানুষ এই নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। নদীর জোয়ার-ভাটার নিয়মের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে তাঁদের প্রতিদিনের অন্নের সংস্থান।” “এই নদী পার হয়েই কাঠুরে, মধু সংগ্রহকারী (মৌলে) এবং জেলেরা গভীর সুন্দরবনে প্রবেশ করেন।” শম্ভু বাবুর মতে, “নদীটি যেমন একদিকে জীবন দেয়, অন্যদিকে প্রতি মুহূর্তে বিপদের ঝুঁকিও বুকে নিয়ে চলে।”
দীর্ঘ বছর ধরে নদীকে খুব কাছ থেকে দেখা শম্ভু চরণ বাবু নদীর রুদ্র রূপেরও সাক্ষী। বিভিন্ন সময়ে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় (যেমন আয়লা, আম্ফান, ইয়াস) এবং তার ফলে রায়মঙ্গলের জলোচ্ছ্বাস কীভাবে আস্ত গ্রামকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা তিনি ভোলেননি। তাঁর অভিজ্ঞতা বলে, রায়মঙ্গলের তীব্র স্রোত প্রতিনিয়ত পাড় ভাঙছে। মাটির বাঁধ ভেঙে নোনা জল চাষের জমিতে ঢুকে পড়ায় বিঘার পর বিঘা জমি অনুর্বর হয়ে পড়েছে, যা গ্রামবাসীদের চরম সংকটে ফেলে দিয়েছে। শম্ভু বাবুর অভিজ্ঞতার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সুন্দরবনের মিষ্টি জলের অভাব। তিনি বলেন, “রায়মঙ্গল নদীর জল তীব্র নোনা।” জোয়ারের সময় এই নোনা জল যখন নদী উপচে বা বাঁধ ভেঙে ভেতরে ঢোকে, তখন পুকুরের মিষ্টি জলও নষ্ট হয়ে যায়। তখন মিষ্টি জলের সমস্ত মাছ মরে যায়। ফলে এলাকার মানুষকে পানীয় জল ও স্নানের জলের জন্য কতটা কঠিন সংগ্রাম করতে হয়, তা তিনি তাঁর দীর্ঘ জীবনে প্রত্যক্ষ করেছেন।
প্রবীণ এই মানুষের চোখে রায়মঙ্গল নদী কেবলই একটা ভৌগোলিক সত্তা নয়, বরং এক জীবন্ত চরিত্র। তিনি মনে করেন, নদী যেমন গ্রামবাসীদের দুহাত ভরে দেয়, তেমনই ক্ষুব্ধ হলে কেড়ে নেয় মাথা গোঁজার ঠাঁইও। নদীকে ভয় এবং ভক্তি—এই দুই মিশ্র অনুভূতি নিয়েই মাধবকাটী এবং আশেপাশের অন্যান্য এমন বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষকে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকতে হচ্ছে। শম্ভু চরণ গায়েন মহাশয়ের অভিজ্ঞতা মূলত রায়মঙ্গল নদীর দুটি রূপকে তুলে ধরে—একদিকে তা জীবনদায়ী ও সংস্কৃতির অংশ, অন্যদিকে তা প্রতিনিয়ত ভাঙন এবং নোনা জলের আতঙ্কে ভরা এক রূপ। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই জীবনসংগ্রামই তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মূল নির্যাস। ক্ষিপ্র ও ভয়ঙ্কর হওয়া সত্ত্বেও রায়মঙ্গল নদী এই অঞ্চলের মানুষের কাছে এক পরম আশীর্বাদ।
লেখক পরিচিতি : অর্দ্ধেন্দু গায়েন
জন্ম উত্তর চব্বিশ পরগনার যোগেশগঞ্জের মাধবকাটী গ্রামে।পেশায় সরকারী চাকুরী হলেও নেশা পড়াশোনা , ইচ্ছে হলেই লেখা-সে কবিতা, ছোটগল্প, অণুগল্প, প্রবন্ধ যা কিছু হতে পারে, অবসরে বাগান করা,ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা ইত্যাদি।তবে সব পরিচয়ের সমাপ্তি ঘটে সৃষ্টিতে --পাঠক যেভাবে চিনবেন আমি সেভাবেই থেকে যাবো।

