লেখক : অরণ্য নীল
বাইরে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। চারদিকের স্তব্ধ, ধূসর আবহাওয়া স্কুলের এই চেনা ক্লাসরুমটাকে কেমন যেন একটা গুমোট, দমবন্ধ করা শান্ত রূপ দিয়েছে। পিছনের বেঞ্চগুলোতে ক্লাসের বাকি ছেলেমেয়েরা জটলা পাকিয়ে হাসাহাসি করছে, কিন্তু ক্লাসরুমের একদম সামনের সারির দু’টো মানুষের কান পর্যন্ত সেই চেনা কোলাহল পৌঁছচ্ছে না। তাদের চারপাশে যেন এক অদৃশ্য কান্নার দেওয়াল খাড়া হয়ে আছে।
জানালার ধারের প্রথম বেঞ্চে একা বসে আছে আকাশ। জানালার ফাঁক গলে বৃষ্টির ঠাণ্ডা ছাঁট এসে সরাসরি তার মুখে লাগছে, কিন্তু তার সরার কোন তাগিদ নেই। আসলে ভিতরের পুড়ে ছারখার হতে থাকা মানুষটার কাছে বাইরের এই ঠাণ্ডা জলের কণাগুলো বড়ই নগণ্য। সে আর একবারের জন্যও উল্টো দিকের কোণের প্রথম বেঞ্চটার দিকে তাকাচ্ছে না। তার বসার ভঙ্গি ও চোখের দৃষ্টিতে এক চরম নিস্পৃহতা, এক গভীর উদাসীনতা। নিজেকে সে জীবন্ত একটা পাথরের মত গুটিয়ে নিয়েছে।
বাইরে থেকে তাকে যতটা শান্ত দেখাচ্ছে, তার বুকের ভিতরটা কিন্তু এক তীব্র আত্মগ্লানি আর যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠছে। আকাশ নিজের মনেই ফুঁপিয়ে উঠছিল, “বৃষ্টি কি এখনও আমার কথা ভাবে? ও কি এই বৃষ্টির দিনে একবারের জন্যও আমাদের সেই পুরনো দিনগুলো মনে করে?” কিন্তু ঠিক তার পরের মুহূর্তেই এক চরম হীনম্মন্যতা তাকে গ্রাস করছিল। নিজের ওপরেই এক তীব্র ঘৃণা আছড়ে পড়ল আকাশের। “ধুর! কেন ভাববে ও আমার কথা? কে আমি ওর? কেউ নই। একসময় হয়ত ফুসফুস ভরে নেওয়া নিঃশ্বাসের মত ছিলাম। কিন্তু এখন তো আকাশটাই ফুরিয়ে গিয়েছে, শুকিয়ে গিয়েছে। ও হয়ত আমাকে এখন চরম ঘৃণা করে। ভাবে, এই অভিশপ্ত ছেলেটার জন্যই আমার হাসিখুশি জীবনে এত অশান্তি এল। আমি নিজেকে বোঝাতে পারছি না কেন যে ও আমাকে আর দেখতেই চায় না? কেন আজ এই বৃষ্টিভেজা দুপুরে হুট করে এতগুলো বছর ধরে চাপা থাকা পুরনো ক্ষতটা এভাবে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে? কেন বুকটা এভাবে ছিঁড়ে যাচ্ছে?” আকাশ নিজের মনেই এমন হাজারটা না-বলা কথা বলে যাচ্ছিল, যার কোন শ্রোতা নেই।
অথচ আজ কতদিন হ’ল ওদের মধ্যে কোন কথা হয় না! ছোটবেলা থেকে একসাথে ধুলোবালি মেখে বড় হওয়া, একই ছাতার নিচে স্কুলে আসা-যাওয়া, মনের সমস্ত গোপন কথাগুলো সবার আগে একে অপরকে বলা—এই ছিল ওদের চেনা পৃথিবী। আকাশ কোনদিন বৃষ্টিকে ভালবাসার কথা মুখ ফুটে বলেনি। সে নিজের মনে বৃষ্টিকে আরাধনা করলেও, এই সুন্দর বন্ধুত্বটা হারানোর ভয়ে নিজের অনুভূতি সারাজীবন নিজের বুকেই কবর দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু সমাজ আর তাদের ক্লাসের তথাকথিত বন্ধুরা ছেলে-মেয়ের এমন নিটোল, পবিত্র বন্ধুত্বকে নোংরা চশমা দিয়ে দেখল। শুরু হ’ল বিষাক্ত ট্রোলিং। পেছনের বেঞ্চ থেকে উড়ে আসা বাঁকা কথা আর কুৎসিত গুঞ্জন ওদের ওপর পাহাড়সম মানসিক চাপ তৈরি করেছিল। সবাই যখন ওদের দিকে আঙুল তুলতে শুরু করল, লোকলজ্জা আর অপমানের তীব্র আশঙ্কায় বৃষ্টি আর নিতে পারল না। সে আকাশের সাথে কথা বলা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিল। শেষবার যখন ওদের দেখা হয়েছিল, বৃষ্টি শুধু চোখভর্তি জল আর একরাশ ক্ষোভ নিয়ে বলেছিল, “আই জাস্ট ওয়াণ্ট টু লিভ আকাশ! সমাজ আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। দয়া করে আমাকে আমার মত থাকতে দাও। লেট মি লিভ!” বৃষ্টির চোখের সেই অসহায় আকুতি দেখে আকাশ নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিয়েছিল। সে আর কোনদিন বৃষ্টিকে নিজের ছায়াটাও ছুঁতে দেয়নি।
আকাশ যখন জানালার বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিজের এই তীব্র মানসিক গোলকধাঁধায় মগ্ন, ঠিক তখনই উল্টো দিকের কোণের বেঞ্চ থেকে বৃষ্টি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল আকাশের দিকে। আকাশ তার দিকে তাকিয়ে নেই, আকাশ তাকে দেখছে না। আর এই সুযোগেই বৃষ্টির চোখের কোণদু’টো আজ বাঁধভাঙা বন্যায় ভিজে উঠল। সে একদৃষ্টিতে আকাশের সেই চেনা অথচ আজ বড্ড অচেনা, ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টির মনের ভিতরে জমে থাকা কষ্টের পাথরগুলো একে একে গলতে শুরু করল।
বৃষ্টি মনে মনে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল, “আকাশ কি আমাকে সত্যি ভালোবাসত? যদি বাসতই, তবে কোনদিন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার হাত দু’টো ধরে সরাসরি বলল না কেন? কেন আজীবন আড়াল করে রাখল?” এক তীব্র অপরাধবোধ তার কলিজাটা যেন ছিঁড়ে নিতে চাইল। “আর যদি ও আমাকে ভাল না-ই বেসে থাকে, তবে অন্য মানুষের বাঁকা কথা আর ট্রোলিংয়ের সমস্ত দায় ওর ওপর চাপিয়ে আমি আমাদের এত সুন্দর একটা আশ্রয় কেন ধুলোয় মিশিয়ে দিলাম? দোষটা কি আসলে আমারই ছিল? ও যদি ভালবেসেও থাকে, আর নাও বা বেসে থাকে, আমাদের বন্ধুত্বটা তো আমরা আগলে রাখতে পারতাম! আমি শুধু সমাজের ভয়ে, কাপুরুষের মত ওকে মাঝপথে ছেড়ে দিলাম। কত কঠোর, কত নিষ্ঠুর কথা শোনালাম ওকে! আজও ওর সাথে এমন আচরণ করি যেন ও আমার কোন চেনা শত্রু!”
বৃষ্টির চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল নিঃশব্দে গাল বেয়ে নেমে এল। আকাশের সেই নিথর প্রোফাইলের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে চিৎকার করে বলল, “সবাই ভাবে আমি খুব সুখে আছি, শান্তিতে আছি। কিন্তু আমার বুকটা যে প্রতিদিন কীভাবে খালি হয়ে যায়, সেটা কেউ জানে না। আকাশের মত একজন বেস্ট ফ্রেণ্ডকে হারিয়ে আজ আমিও বড্ড একা, বড্ড নিঃস্ব হয়ে গেছি এই ভিড়ে। আকাশ কি এখন আমাকে চরম ঘৃণা করে? নাকি ও আজও ওই মেঘলা জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে আমাকে আগের মতই নিজের সেই চাইল্ডহুড ফ্রেণ্ড ভাবে?”
আকাশ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল উদাসীন হয়ে নিজের শেষ না হওয়া যন্ত্রণায়, আর বৃষ্টি ক্লাসরুমের অন্য কোণায় বসে চোখের জলে নিজের ভুলের আর না-পাওয়ার হিসাব মেলাতে লাগল। কেউ কারও দিকে তাকাল না, কেউ কারও সাথে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। ঝমঝম বৃষ্টির তীব্র শব্দে বাকিদের কোলাহল ঢাকা পড়ে গেল, আর তার চেয়েও বেশি ঢাকা পড়ে রইল দু’টো চেনা মানুষের দু’টি ভিন্ন পৃথিবীর সমান্তরাল হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস।
বাস্তব বড়ই নিষ্ঠুর। এখানে কোন জাদুর ছোঁয়া থাকে না, যে সব ভুল বোঝাবুঝি এক নিমেষে মিটে যাবে। লোকলজ্জা আর অহঙ্কারের জাঁতাকলে পিষে কিছু নিখাদ বন্ধুত্ব এভাবেই আজীবন মৌনতার চাদরে ঢাকা পড়ে যায়, যার কোন সহজ উত্তর কোনদিন কোন আকাশ বা কোন বৃষ্টির কাছে মেলে না।
লেখক পরিচিতি : অরণ্য নীল
অরণ্য নীল এমন একজন কথক, যিনি নিজের নাম ও পরিচয়কে লোকচক্ষুর অন্তরালে রেখে শব্দের তুলিতে মনের অব্যক্ত অনুভূতিগুলোকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলেন। তাঁর লেখার মূল শক্তি হলো—চরম বাস্তবতা, না-বলা হাহাকার এবং সমাজের আড়ালে পিষে যাওয়া সম্পর্কের নীরব দীর্ঘশ্বাস।তিনি বিশ্বাস করেন, লেখকের নিজের চেহারার চেয়ে তাঁর ভেতরের ক্ষত এবং গল্পগুলোর বেঁচে থাকা বেশি জরুরি। চারপাশের চেনা ভিড়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখা এই লেখক মূলত একাকী মনস্তত্ত্ব এবং একতরফা নীরব ভালোবাসার গল্প বুনে যান।

