ভোলা দাদা আর বাঘের গল্প

লেখক : অর্হণ জানা

[লেখক পরিচিতি: মনোজ দাস (১৯৩৪-২০২১) একজন ভারতীয় ওড়িয়া লেখক। ‘সাইক্লোনস’ এবং ‘আ টাইগার অ্যাট টোয়াইলাইট’ উপন্যাসগুলির জন্য তিনি বিখ্যাত। সরস্বতী সম্মান, সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার-সহ নানান সম্মানে ভূষিত হয়েছেন সাহিত্যিক মনোজ দাস।]

আমাদের গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে ভোলা দাদা আর তাঁর স্ত্রী থাকতেন। তাঁদের কুঁড়েঘরটি একটি বিশাল বকুল গাছের ছায়ায় ঢাকা ছিল। বসন্ত এলে গাছটি ঘন পল্লবে ভরে উঠত এবং তার ছোট ছোট লাল ফল সারাক্ষণ তাঁদের উঠোনে ঝরে পড়ত। সেই গাছেই একদল বাঁদর স্থায়ী বাসা বেঁধেছিল। ভোলা দাদা কিংবা তাঁর স্ত্রী এতে কোনও আপত্তি করেননি।

আমার স্পষ্ট মনে পরে সেই চাঁদ-ঝলমল রাতের কথা, যখন আমরা শিবের মেলা থেকে ফিরছিলাম। তখনও আমাকে শিশু হিসেবেই ধরা হত। ফলে, শক্তসমর্থ গ্রামবাসীদের কাঁধে চড়ে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ আমার ছিল প্রচুর। রাস্তাটি ছিল দীর্ঘ, আর কুয়াশার ওপরে চাঁদটাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন তার সর্দি লেগেছে। আমি গ্রামের চৌকিদারের কাঁধে মাথা রেখে তন্দ্রায় ঢুলে পড়েছিলাম।

বাবাকে সবাই ভীষণ শ্রদ্ধা করত, তাঁর সঙ্গে হাঁটতে পারলে গ্রামবাসীরা সৌভাগ্যবান মনে করত নিজেদের। ভোলা দাদা বয়সে বাবার চেয়ে একটু বড় হলেও, বাবার কথা তিনি সব সময় সবচেয়ে আগে সমর্থন করতেন।

হঠাৎ ভোলা দাদা এক বিকট আর্তনাদ করে উঠলেন। আমাদের দল থমকে দাঁড়াল। জানা গেল, তিনি তাঁর মেয়ের ছেলেকে মেলায় এনেছিলেন। সে আমারই সমবয়সি। ভিড়ের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে ছেলেটির দু’টি আঙুল শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। কখন যে সেই আঙুলগুলো হাত থেকে ফসকে গেছে, তিনি বুঝতেই পারেননি। কিন্তু তাঁর মুঠো তখনও শক্তই ছিল। একজন যখন জিজ্ঞেস করল, তাঁর মুঠোয় কী আছে, তখনই তিনি নাতির কথা মনে করে চিৎকার করে উঠলেন। বাবা সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দলের দু’জন তীক্ষ্ণদৃষ্টি লোককে সঙ্গে নিয়ে ভোলা দাদাকে মেলায় ফিরে যেতে বললেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলেটিকে পাওয়া গেল। সে একটি গরুর পেটের নিচে আশ্রয় নিয়ে অপরিচিত ভিড়ের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল।

এরপর পুরো পথ আমি জেগে ছিলাম এবং বাবার মুখে ভোলা দাদার আরেকটি গল্প শুনলাম।

ভোলা দাদার বাপ-ঠাকুরদারাও আমাদের বাড়িতে কাজ করতেন। তাই তিনি প্রায়ই আমাদের বাড়িতেই সময় কাটাতেন। বহু বছর আগে, একদিন দুপুরে তাঁকে আমাদের বারান্দায় জিভ বের করে শুয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। তাঁকে ওই অবস্থায় দেখে সবার শরীর দিয়ে একটা শিহরণ বয়ে গিয়েছিল। সবাই ভেবে নিয়েছিল তিনি বুঝি মারা গেছেন। কিন্তু আসলে হয়েছিল কী, ঘণ্টাখানেক আগে কে একজন তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। লজ্জায় তিনি জিভ বার করেছিলেন, আর ঘুমিয়ে পড়ার পর সেটি ভেতরে নিতেই ভুলে গিয়েছিলেন! পরের দিন বাবা যখন এই কাহিনিটি ছাদে বসে সবাইকে শোনাচ্ছিলেন, ভোলা দাদা লজ্জায় মাথা নিচু করে ছিলেন।

আরেক দিনের ঘটনা – এক বর্ষার বিকেলে ভোলা দাদা উত্তেজনায় উন্মত্ত হয়ে বাবাদের বললেন, তিনি নাকি সমুদ্রতটে কিছু দস্যুকে বালির নিচে একটি বড় বাক্স পুঁতে রাখতে দেখেছেন। তারপর তাদের একটি সরু নৌকোয় চেপে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যেতেও তিনি দেখেছেন। বাবারা সঙ্গে সঙ্গে গুপ্তধনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। সন্ধ্যা গড়িয়ে এক অদ্ভুত রাত নেমে এল। শুধু মেঘের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ঠিকরে বেরোচ্ছিল এবং মাঝে মাঝে বাতাসের হাহাকার আর বজ্রপাতে ঝলসে যাওয়া এক তালগাছের কোটর থেকে পেঁচার ডাক ভেসে আসছিল। মধ্যরাত পেরোতেই শেয়ালের চিৎকার শোনা গেল। হঠাৎ ভোলা দাদা বালির ওপর লুটিয়ে পড়লেন। বন্ধুরা ছুটে গেলেন তাঁর কাছে। ভোলা দাদা কখনও মিথ্যে বলতেন না। কিছুক্ষণ পর তিনি স্বীকার করলেন, সবটাই নাকি একটি দিবাস্বপ্ন ছিল। তিনি ভুল করে সেটিকে সত্যি ভেবে ফেলেছিলেন।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটেছিল সুন্দরবনে। তখনও জায়গাটি ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল। সরু নদীপথের মাঝে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ঘুরে বেড়াত। আমাদের পূর্বপুরুষরা সেখানে জমিদারি দেখাশোনা করতেন, আর ভোলা দাদাকেও মাঝে মাঝে সেখানে পাঠানো হত। সুন্দরবনে দিনের বেলাতেও কেউ একা হাঁটত না। বাঘ ছাড়াও সেখানে কুমিরের ভয় ছিল। সন্ধ্যার পর সবাই দল বেঁধে চলাফেরা করত। অনেক সময় একজন ওঝা তাদের নেতৃত্ব দিতেন, তিনি অদ্ভুত চিৎকার করে জন্তু-জানোয়ারদের ভয় দেখাতেন।

একদিন ভোলা দাদা বাজার থেকে ফিরছিলেন একদল লোকের সঙ্গে। কখন যে তিনি দল থেকে পিছিয়ে পড়েছেন, তা বুঝতেই পারেননি। হঠাৎ তিনি দেখলেন, তাঁর থেকে পাঁচ গজ দূরে একটি পূর্ণবয়স্ক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার দাঁড়িয়ে আছে, চোখ দু’টি স্থির করে তাঁর মুখের দিকে। ভোলা দাদা সঙ্গে সঙ্গে একটি বটগাছে উঠে পড়লেন। বাঘটি গাছের চারপাশে ঘুরতে লাগল, তারপর একটি ঝোপের নিচে বসে তাঁর দিকে এক ভাবে তাকিয়ে রইল।

রাত নেমে এল। জঙ্গল অন্ধকার আর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বাঘের লেজ দিয়ে শুকনো পাতায় আঘাত করার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। ভোলাদাদা দেখলেন তার নীলচে-হলুদ চোখ দু’টি গাছের দিকেই নিক্ষেপ করা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবেই কেটে গেল।

ভোর হতেই চারিদিকে ঘুঘুর ‘কু-কু’ ডাক শোনা গেল। ভোলা দাদা নেমে এলেন। কাছেই সাঁওতালদের একটি বসতি ছিল। তিনি সেখানে গিয়ে একটি লোকের কাছে বিড়ি ধরানোর জন্য আগুন চাইলেন। লোকটি সব কিছুই দেখেছিল। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনার রহস্যটা কী, স্যার, যে আপনি ওই ক্ষুধার্ত বাঘের সামনে দিয়ে চলে এলেন আর সে কিছুই করল না?”
ভোলা দাদা ঝোপের দিকে তাকালেন। বাঘটি তখন পা ছড়িয়ে হাই তুলছিল। ভোলা দাদা নাকি তখনই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন।

অর্ধশতাব্দী পরে, একদিন সকালে ভোলা দাদা শান্তিতে ঘুমের মধ্যে মারা গেলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল পঁচানব্বই। আমরা সবাই খুব কেঁদেছিলাম। কিন্তু সবচেয়ে অভিনব শোকপ্রকাশটি করেছিলেন তাঁর আশি বছরের বৃদ্ধা স্ত্রী। বুড়ো মানুষটা বোধহয় শ্বাস নিতেই ভুলে গিয়েছিল! তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন।


লেখক পরিচিতি : অর্হণ জানা
অর্হণ জানা। জন্ম ৩১ ডিসেম্বর, ২০০৬। বর্তমান নিবাস বড়জাগুলি, নদিয়া। ছোট থেকেই লিখতে ভালবাসি--- গান, গল্প, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ। সুকুমার রায় আমার গুরু। আমার পথপ্রদর্শক। এ যাবৎ কয়েকটি পত্রপত্রিকা ও সংকলন গ্রন্থে আমার লেখা কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প ও ছড়া প্রকাশিত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up