খাঁচায় বন্দি নগরজীবন: বিশ্বস্ত কর্মী, শনিবার ও আমাদের বাস্তবতা

লেখক : অলভ্য ঘোষ

এই কিছুদিন আগে বিমল রায়ের একটি ছবি দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, কর্মসংস্থানের সমস্যাটা নতুন নয়। ছবির নাম “নৌকরি”, নায়ক কিশোর কুমার। এই ছবিতে কিশোর কুমারকে দিয়ে গান গাওয়াতে চাননি সুরকার সলিল চৌধুরী; তিনি চেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে গান গাওয়াতে। কিশোর কুমার অনুরোধ করে বারবার সলিল চৌধুরীর কাছে ছুটে যান। সলিল নাকি বলেছিলেন, সিনেমায় প্লেব্যাক করার মত কণ্ঠ কিশোর কুমারের নেই। শুধু তাই নয়, শচীন দেব বর্মনও—যিনি পরে আরাধনা ছবিতে কিশোর কুমারকে দিয়ে একের পর এক সুপারহিট গান গাইয়েছিলেন—সেই সময় কিশোর কুমারকে বলেছিলেন, “কিশোর, তুমি তোমার নিজস্ব গায়কি তৈরি করো।” আসলে কিশোর তখন কে. এল. সায়গলকে নকল করে গাইতেন। যাই হোক, শেষমেশ দাদাভাই অশোক কুমারের অনুরোধে নৌকরি ছবিতে গানগুলো কিশোরকেই দিয়ে গাওয়ানো হয়। বিষয়টা সেটা নয়। বিষয় হ’ল, ১৯৫৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিতে কলকাতায় চাকরির স্বপ্ন নিয়ে আসা নায়কের বেকারত্বকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সেই বেকারত্ব আজও একইভাবে বিদ্যমান।

গতকাল প্রবীর বাগচী মহাশয়ের নিমন্ত্রণে চারণিক প্রযোজিত দু’টি নাটক দেখলাম রবীন্দ্র সদনে। প্রথম নাটক, সংঘমিত্রা চট্টোপাধ্যায় অনূদিত, ওয়াল্টার উইকস-অনুপ্রাণিত, আনন্দ ভট্টাচার্য পরিচালিত “বিশ্বস্ত কর্মী”। দ্বিতীয় নাটকটি বাদল সরকার রচিত ও সুকুমার কর্মকার পরিচালিত “শনিবার”।

প্রথম নাটক “বিশ্বস্ত কর্মী” আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে। বিশেষত এই নাটকের মঞ্চসজ্জা অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। হাই-রাইজিং বাড়ি এবং তার ওপর একটি দোদুল্যমান দোলনার ছায়া—যেন নাগরিক সভ্যতার ওপর ঝুলন্ত এক খাঁচা, যা এই নগর জীবনের মানুষকে বন্দি করে রাখছে, গলা টিপে ধরছে। মঞ্চসজ্জা করেছেন প্রবীর বাগচী এবং আলো পরিকল্পনায় বাদল দাস—দু’টিই দুর্দান্ত লেগেছে। নাটকটি ছোট ছোট দৃশ্যে সাজানো, যা ভীষণ মনোমুগ্ধকর। যদিও কিছু জায়গায় অভিনয় কিছুটা গতানুগতিক বলে মনে হয়েছে। মোটের ওপর নাটকটি ভালো, তবে অভিনয়ের রীতি নিয়ে আরও ভাবনার সুযোগ রয়েছে। অভিনয়ের মধ্যে কিছু ‘বিজনেস’ রেখে সেটিকে স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু তবুও কয়েকটি জায়গায় মনে হয়েছে, আমরা এখনও গিরিশ ঘোষ ও অর্ধেন্দুশেখর মুস্তফির সময়ের বাংলা থিয়েটার পুরোপুরি অতিক্রম করে নতুন ধারায় প্রবেশ করতে পারিনি। বিশেষতঃ, মঞ্চে বাচিক প্রক্ষেপণের ক্ষেত্রে আমাদের বাচনরীতি নিয়ে আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়। রবীন্দ্র সদনের সাউন্ড সিস্টেম অত্যন্ত ভাল, তাই দর্শকাসনের শেষ প্রান্তে বসে থাকা দর্শকের কাছে পৌঁছনোর জন্য অতিরিক্ত জোরে সংলাপ বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। বরং জোরে বলতে গিয়ে অনেক সময় আবেগের সূক্ষ্ম নির্মাণ নষ্ট হয়ে যায়, যা সিনেমায় তুলনামূলকভাবে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে “বিশ্বস্ত কর্মী” নাটকের বিষয়বস্তু অতুলনীয়। একদিকে চাকরি হারানোর ভয়, অন্যদিকে মানুষের জীবন থেকে সময় ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত জীবন সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে; কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় কাটাতে হচ্ছে, এমনকি বাড়িতে এসেও অফিসের কাজ করতে হচ্ছে। বিশ্বস্ত থাকার তাগিদে একজন মানুষ যেন একা একশ জনের কাজ করে চলেছে, তবুও শেষমেশ নিজের চাকরি রক্ষা করতে পারছে না। এ গল্প আজকেরই গল্প। নাটকে যে নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষের যন্ত্রে পরিণত হয়ে পড়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা আধুনিক সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। নাটকটি দেখতে দেখতে আমার কয়েক বছর আগে আন্তর্জাতিকভাবে সাড়া ফেলা আদিত্য বিক্রমের ”আসা যাওয়ার মাঝে” ছবিটির কথা মনে পড়ছিল। এক দম্পতির কর্মব্যস্ত জীবন, যে জীবন তাদের প্রেম-ভালোবাসার জগৎ থেকে সরিয়ে এক অদ্ভুত, যান্ত্রিক জীবনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

দ্বিতীয় নাটক “শনিবার”—বাংলা তথা ভারতের থার্ড থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা বাদল সরকারের রচনা। এবং ইন্দ্রজিৎ-এর রচয়িতা হিসেবে তিনি বাংলা তথা ভারতীয় নাট্যধারার অন্যতম আধুনিকতম নাট্যকার। তাঁর নাটকের যে বৈশিষ্ট্য—রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের গভীর মনস্তাত্ত্বিক জগতের উন্মোচন—তা এই নাটকেও স্পষ্ট। এই নাটকে বিশেষ করে মায়ের ভূমিকায় অভিনেত্রীর অভিনয় প্রাণবন্ত লেগেছে। তবে আবারও অভিনয়ের রীতি এবং উপস্থাপনায় কোথাও যেন একটি আটপৌরে আটকে যাওয়ার অনুভূতি বারবার সামনে এসেছে। অনেক সময় মনে হয়েছে, যেন অফিস ক্লাবের থিয়েটারের মত, কিছু কিছু জায়গা বেশ অ্যামেচারিস্টিক। মঞ্চসজ্জায় তেমন কোন চমক চোখে পড়েনি। আমি জানি, নাটকের দলগুলোকে কতটা দৈন্য ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয়। তবুও সৃজনশীল জগতে বাজেটের সীমা অতিক্রম করে শিল্পের মানকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে, এই আশাই রাখি। মঞ্চের ডান ও বাম দিক—এই দুই দিককে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা জরুরি, কোনটি ঘরের ভেতর, কোনটি বাইরে। এই নাটকে সেই জায়গায় কিছু অসামঞ্জস্য ছিল। এক পর্যায়ে মনে হয়েছে, মা যেন ঘরের বাইরের দিক থেকেই দুধের গ্লাস নিয়ে প্রবেশ করলেন, যদিও শুরুতে বিপরীত দিকটিকেই ঘরের ভেতর হিসেবে দেখানো হয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা, নাটকটির গতি কিছুটা মন্থর এবং চরিত্রগুলির মধ্যে একধরণের জড়তা স্পষ্ট। পরিসমাপ্তিও তেমন মনোগ্রাহী হয়ে ওঠেনি। তবে কয়েকটি দৃশ্য ভীষণ ভাল লেগেছে, বিশেষ করে যেখানে নায়ক তার মনোজগতে প্রবেশ করছে এবং আবার ফিরে আসছে। এই ধরনের দৃশ্য মঞ্চে উপস্থাপন করা অত্যন্ত জটিল, যা পরিচালকের দক্ষতায় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

নাটক দেখতে যাওয়া-আসার পথে ভবানীপুর, হরিশ মুখার্জি রোড দিয়ে যেতে যেতে আরেকটি বিষয় চোখে পড়ল—ভোটের হাওয়া স্পষ্ট, কিন্তু কার পক্ষে তা বলা কঠিন। মিছিল বেরোলেও লোকসমাগম খুব বেশি চোখে পড়েনি। ব্যানার ও পার্টির উপস্থিতি থাকলেও মানুষের সংখ্যা ছিল কম—এক ধরণের দৈন্যতা স্পষ্ট। আরও কষ্ট দিয়েছে রবীন্দ্র সদনের প্রায় ফাঁকা হলঘর। অল্প কয়েকজন দর্শক নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করা সত্যিই বেদনাদায়ক। যারা এত আয়োজন করে নাটক করেন, দর্শক না পেলে তাদের সেই পরিশ্রম অনেকটাই বিফলে যায়—এই দৃশ্য মনকে নাড়া দিয়ে গেল।


লেখক পরিচিতি : অলভ্য ঘোষ
রবি ঘোষ ও কমলা ঘোষের তিন পুত্রের মধ্যে মধ্যম পুত্র অলভ্য ঘোষ ১৯৭৬ সালের ১০ জুন কলকাতার টালিগঞ্জে জন্ম গ্রহণ করেন; ছোট থেকেই একরোখা অলভ্য প্রথাগত শিক্ষা সমাজ ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থাশীল-প্রতিবাদী। শিল্প কলা তার উপজীব্য হলেও ব্যতিক্রমী এই মানুষটি নিজেকে একজন সৈনিক বলে মনে করেন যার অস্ত্র কালি মাটি কলম। দেশে বিদেশের পত্র পত্রিকায় তার কাব্য, ছোটগল্প, প্রবন্ধ সসম্মানে প্রকাশিত হবার পর তিনি স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণে আত্মমগ্ন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up