লেখক : সামিরা হিমু
দুপুরের কড়া রোদ বারান্দার গ্রিল গলে ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। ফ্যানের একটানা ঘড়ঘড় শব্দ ছাড়া পুরো বাড়িটায় অদ্ভুত একটা নিস্তব্ধতা। রিনভী মেঝের ওপর বসে পুরনো কিছু বই গোছাচ্ছিল। সামনেই ওর ফাইনাল পরীক্ষা, অথচ পড়ার টেবিলে বসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ওর নেই। রান্নাঘর থেকে নূরজাহান বেগমের হাঁড়ি-পাতিল নাড়ার শব্দ আসছে। একটু পরপরই তিনি আপনমনে বকছেন।
“মা, বকছ কেন একা একা?” রিনভী বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতেই গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করল।
“বকব না? বাজারের যা অবস্থা! লাউয়ের দাম শুনেছিস? একশ টাকা পিস! মধ্যবিত্ত মানুষের তো এখন না খেয়ে মরার দশা।” নূরজাহান বেগম রান্নাঘর থেকেই উত্তর দিলেন।
রিনভী আর কিছু বলল না। মায়ের এই আক্ষেপ নতুন কিছু নয়। মাসের শেষ দিকটায় এসে সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে নূরজাহান বেগমের মেজাজ এমনিতেই খিটখিটে হয়ে থাকে। রিনভী চুপচাপ নিজের কাজে মন দিল। ঠিক তখনই কলিংবেলটা বেজে উঠল।
“রিনভী, দেখ তো মা কে এল এই ভরদুপুরে!”
রিনভী উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখল আহজার দাঁড়িয়ে আছে। পরনে একটা হালকা নীল রঙের শার্ট, যার হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কাঁধের ব্যাগটা এক হাতে ধরে সে হাঁপাচ্ছে।
“শাফায়েত কই খালাম্মা?” আহজার ভেতরে ঢুকতে ঢুকতেই জিজ্ঞেস করল।
নূরজাহান বেগম আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ড্রয়িংরুমে এলেন। “ও তো কেবল কোচিংয়ের দিকে গেল, জায়ান আসছিল ওর সাথে।”
“আচ্ছা খালাম্মা!”
“তোমার শরীর কেমন এখন আহজার? শাফায়েত বলল জ্বর বাধিয়েছ। সকালের নাস্তা হয়েছে?”
“উমম… পরে করে নেব খালাম্মা।”
“হয়েছে, ভেতরে এস। মেসে এজন্যই ছেলেমেয়েকে রাখা উচিৎ নয়। ইস, চেহারার কি হাল করেছ! রিনভী, ওকে ফ্যানের নিচে বসতে দে। আমি শরবত করে আনছি।”
নূরজাহান বেগম রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। আহজার সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। ব্যাগটা পাশে রেখে চোখ বন্ধ করে সোফার পেছনের দিকে মাথা এলিয়ে দিল। রিনভী দাঁড়িয়ে ছিল একটু দূরে।
“পানি খাবেন এক গ্লাস?”
“হুম, দে। ফ্রিজের দিস না, নরমাল পানি দে।”
“আচ্ছা।”
রিনভী পানি এনে আহজারের দিকে এগিয়ে দিল। আহজার এক চুমুকে পুরো গ্লাসটা খালি করে গ্লাসটা রিনভীর হাতে ফেরত দিল।
“আজ তো আপনার ইণ্টারভিউ ছিল না?” রিনভী গ্লাসটা টেবিলে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল।
“ছিল তো।”
“কেমন হ’ল?”
“যেমন হয় আর কি। সিভি দেখে বলল এক্সপিরিয়েন্স নেই। আরে ভাই, ফ্রেশারদের যদি কেউ চাকরি না দেয়, তাহলে এক্সপিরিয়েন্স কি আকাশ থেকে পড়বে?” আহজার বিরক্তি নিয়ে বলল।
“বাদ দিন। একটা না একটা হয়ে যাবে।”
“হবে তো বটেই। কিন্তু কবে হবে সেটাই কথা। মেসের ভাড়া তিন মাস ধরে বাকি। বাড়ি থেকে টাকা চাইতে ইচ্ছে করে না। আব্বার রিটায়ারমেণ্টের টাকায় সংসার চলে, তার ওপর আমার এই বোঝা।”
রিনভী চুপ করে রইল। কিছু মানুষের নীরবতাগুলো বড্ড অদ্ভুত। কখনও তা অভিমানের, কখনও বা নিছক ক্লান্তির। তবে কিছু নীরবতা থাকে, যা কেবলই অভ্যাসের। মধ্যবিত্তের স্বপ্নগুলো হয় খুব অদ্ভুত। এরা আকাশ ছুঁতে চায় না, শুধু একটা মজবুত ছাদ চায়। অথচ সেই ছাদটুকু বানাতেই এদের জীবনের অর্ধেকটা সময় কেটে যায়।
“তোর পড়াশোনার কী অবস্থা?” আহজার চোখ বন্ধ রেখেই জিজ্ঞেস করল।
“চলছে। সামনের মাসে ফাইনাল।”
“প্রিপারেশন কেমন?”
“মোটামুটি। তবে ম্যাথ নিয়ে একটু ভয়ে আছি।”
“ভয়ের কী আছে? শাফায়েতকে বলিস দেখিয়ে দিতে। ও তো ম্যাথে ভাল।”
“ভাইয়ার নিজেরই তো পড়ার ঠিক নেই। সারাদিন টো-টো করে ঘুরে বেড়ায়।”
“ওকে একটু সিরিয়াস হতে বলিস। জায়ানের সাথে বেশি ঘুরলে ওরই ক্ষতি। জায়ান বড়লোকের ছেলে, ওর বাপের টাকার অভাব নেই। শাফায়েতের তো তা নয়।”
রিনভী মাথা নাড়ল। আহজারের কথাগুলো বাস্তব। জায়ান আর শাফায়েত খুব ভাল বন্ধু হলেও দুজনের পারিবারিক অবস্থার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ।
নূরজাহান বেগম শরবত নিয়ে এলেন। “নে বাবা, খেয়ে নে। রোদের ভেতর ঘুরে ঘুরে মুখটা একদম শুকিয়ে গেছে।”
“খালাম্মা, এত কষ্ট করার কী দরকার ছিল?”
“কষ্টের কী আছে! তুই তো আমার ছেলের মতই। খেয়ে একটু বিশ্রাম নে। আমি দুপুরের খাবার বাড়ছি।”
“না না খালাম্মা, আমি খাব না। মেসে মিল দেওয়া আছে।”
“চুপ করে বসে থাক। মেসে কী ছাইপাঁশ রাঁধে তা আমার জানা আছে। আজ এখানেই খাবি।”
আহজার আর আপত্তি করল না। নূরজাহান বেগমের কথার ওপর কথা বলার সাহস ওর নেই।
বিকেলের দিকে রোদের তেজ কিছুটা কমে এসেছে। রিনভী ছাদে এসে দাঁড়িয়েছে। ছাদের এক কোণে কয়েকটা টবে গাঁদা আর গোলাপ গাছ লাগানো। রিনভী গাছগুলোতে পানি দিচ্ছিল। হঠাৎ পেছনে পায়ের শব্দ শুনে ঘুরে তাকাল। আহজার।
“কী করিস এখানে?”
“গাছে পানি দিচ্ছি। আপনি গেলেন না?”
“যাব। শাফায়েত আসুক, ওর সাথে একটু কাজ আছে।”
“ওর তো কোচিং থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হবে।”
“হোক। আমার তো আর কোন কাজ নেই। বেকার মানুষের সময়ের অভাব হয় না।”
আহজার এসে ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়াল। রিনভী মগ দিয়ে টবে পানি ঢালতে ঢালতে বলল, “আপনার শার্টের বোতামটা তো ছিঁড়ে গেছে।”
আহজার নিজের শার্টের হাতার দিকে তাকাল। সত্যিই ডান হাতার একটা বোতাম নেই। “ওহ, খেয়াল করিনি। বাসে ওঠার সময় হয়তো কারও ব্যাগের সাথে আটকে ছিঁড়ে গেছে।”
“দাঁড়ান, আমি সুঁই-সুতো নিয়ে আসছি। সেলাই করে দিচ্ছি।”
“এখন? থাক, মেসে গিয়ে লাগিয়ে নেব।”
“মেসে তো সেই রাত্রে ফিরবেন। দিন, পাঁচ মিনিট লাগবে।”
রিনভী নিচে চলে গেল। একটু পরে একটা ছোট কৌটো নিয়ে ফিরে এল। “ব্যাগ থেকে টি-শার্টটা বের করে নিন। এটা খুলে দিন।”
“হুম, দিচ্ছি।”
আহজার ব্যাগ থেকে একটা কালো টি-শার্ট বের করে পরে নিল আর শার্টটা রিনভীর হাতে দিল। রিনভী ছাদের এক কোণে রাখা মোড়াটার ওপর বসে মনোযোগ দিয়ে বোতাম সেলাই করতে লাগল। আহজার চুপচাপ দাঁড়িয়ে রিনভীর কাজ দেখছিল।
“তোর বান্ধবীদের কী খবর? ওই যে, কী যেন নাম… মালিহা?”
“মালিহার তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেল।” রিনভী সুতোয় গিঁট দিতে দিতে বলল।
“বলিস কী! এই বয়সে?”
“ওর বাবার তো বয়স হয়েছে। ভাল ছেলে পেয়েছে, তাই দিয়ে দিচ্ছে। ছেলেও তো বেশ বড়লোক। কানাডায় থাকে।”
“বড়লোক হলেই ভাল থাকা যায়, তাই না রিনভী?”
“জানি না। তবে টাকা থাকলে অন্তত বাসে ঝুলে শার্টের বোতাম ছিঁড়তে হয় না।”
“তা ঠিক। জায়ান কাল নতুন গাড়ি কিনল।”
“তাই নাকি? কোন মডেল?”
“কী জানি! ওর বাবার টাকা, কিনবেই তো। আর আমি আজ বাসে ঝুলে আসতে গিয়ে শার্টের বোতাম ছিঁড়ে ফেলেছি। এটাই জীবন।”
রিনভী শার্টটা এগিয়ে দিল। “নিন, হয়ে গেছে।”
“থ্যাংকস।”
“ওয়েলকাম।”
আহজার শার্টটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল। “শোন…”
“জি?”
“উহুম! কিছু না, যা তুই।”
“ঠিক আছে।”
আজকাল আহজারের কাব্য করতে ভাল লাগে, মনের অজান্তেই আসা ভাবনাগুলোকে ঠাঁই দিয়েছে ডায়েরির পাতায়। নিজের লেখাগুলোকে আবৃত্তি করে শোনাতে ইচ্ছে করে সেই বিশেষ মানুষটাকে, অথচ বেকারত্ব তাকে সেই অনুভূতি থেকে বিরত রেখেছে একশতগজ দূরে। এই বেকারত্ব অদ্ভুৎ বাজে এক জিনিস, যা একজন স্বাভাবিক মানুষকে বিষের যাতনা তুলে দেয় সর্বাঙ্গে।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চারপাশের বাড়িগুলোতে বাতি জ্বলতে শুরু করেছে। দূরের রাস্তা থেকে গাড়ির হর্ণের শব্দ ভেসে আসছে। শাফায়েত মাত্রই বাসায় ফিরেছে। পুরো বাড়িটা ওর হাঁকডাকে সরগরম হয়ে উঠেছে।
“মা! ও মা! খেতে দাও, প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে!” শাফায়েত জুতো খুলতে খুলতেই চিৎকার করল।
“আস্তে কথা বল গাধা! পুরো পাড়া মাথায় তুলছিস কেন?” রিনভী ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ধমক দিল।
“তুই চুপ থাক তো। মা কই?”
“রান্নাঘরে। আহজার ভাইয়া তোর জন্য বসে আছে ড্রয়িংরুমে।”
শাফায়েত ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখল আহজার সোফায় বসে ফোন টিপছে। “আরে ভাইয়া! আপনি কখন এলেন?”
“দুপুরে। তুই তো দেখি নবাবজাদা হয়ে গেছিস। কোচিং শেষ করে এতক্ষণ কোথায় ছিলি?”
“আর বলবেন না ভাইয়া। জায়ানের সাথে একটু ওর নতুন গাড়িতে ঘুরতে গিয়েছিলাম। জোস একটা গাড়ি কিনেছে ভাইয়া!”
“হুম, শুনেছি। তা তোর পড়াশোনার কী খবর? জব খুঁজবি না সারাজীবন বাপের হোটেলেই খাবি?”
“খুঁজছি তো ভাইয়া। আপনি ওই ফার্মটায় কথা বলেছিলেন?”
“বলেছি। কাল বিকেলে আমার মেসে আসিস। সিভিটা রেডি করে নিয়ে আসিস। আমি ফরম্যাট পাঠিয়ে দেব।”
“আচ্ছা ভাইয়া।”
নূরজাহান বেগম চা আর বিস্কুট নিয়ে এলেন। “নে শাফায়েত, চা খা। আহজার, তুইও নে।”
“খালাম্মা, আমি তো বিকেলে একবার খেলাম।”
“আরেকবার খেলে কিছু হবে না। নে।”
চা খেতে খেতে আহজার আর শাফায়েত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতে লাগল। দেশের রাজনীতি, চাকরির বাজার, খেলাধুলা—সবকিছুই উঠে এল তাদের কথায়। রিনভী একপাশে বসে চুপচাপ শুনছিল। কিছু মানুষের উপস্থিতি ঘরের পুরনো আসবাবের মত। খুব একটা চোখে পড়ে না, কিন্তু না থাকলে ঘরটা বড্ড ফাঁকা লাগে। আহজারও ঠিক তেমনই একজন। এই বাড়ির কেউ না হয়েও সে যেন এই পরিবারেরই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ।
“চা খাবেন আরেক কাপ?” রিনভী জিজ্ঞেস করল।
“চিনি ছাড়া দিস।” আহজার কাপটা এগিয়ে দিল।
“আপনার তো আবার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, আদা দেব?”
“দে। লবঙ্গ থাকলে দিস একটা।”
“আচ্ছা।”
রিনভী চা বানাতে রান্নাঘরে চলে গেল। শাফায়েত তখন জায়ানের গাড়ির গল্পে মগ্ন। “জানেন ভাইয়া, গাড়ির ইণ্টিরিয়রটা যা সুন্দর না! একদম প্রিমিয়াম ফিল।”
“তোর এত প্রিমিয়াম ফিল নিয়ে কাজ নেই। তুই নিজের ক্যারিয়ারের দিকে ফোকাস কর। জায়ানের বাবার টাকা আছে, ওর কিছু না করলেও চলবে। তোর কিন্তু চলবে না।” আহজার শান্ত গলায় বলল।
শাফায়েত একটু চুপসে গেল। “জানি ভাইয়া। আমি তো চেষ্টা করছি।”
“চেষ্টাটা আরও বাড়াতে হবে। কম্পিটিশন অনেক বেশি এখন।”
রিনভী চা নিয়ে ফিরে এল। আহজার চায়ে চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করল। “পারফেক্ট হয়েছে চা-টা। থ্যাংকস রিনভী।”
“ওয়েলকাম।”
রাত দশটা বেজে গেছে। আহজার এবার ওঠার জন্য প্রস্তুত হ’ল। “খালাম্মা, আসি আজ।”
“খেয়ে যা বাবা। রাত তো হ’ল।” নূরজাহান বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
“না খালাম্মা, মেসে মিল দেওয়া আছে। না খেলে নষ্ট হবে। এমনিতেই মাসের শেষ, টাকা-পয়সার টানাটানি।”
“আচ্ছা, সাবধানে যাস। আর শোন, শরীরটা খারাপ লাগলে কাল আর বের হোস না। মেসে শুয়ে থাকবি।”
“আচ্ছা খালাম্মা।”
আহজার দরজার দিকে এগিয়ে গেল। রিনভী ওর পেছন পেছন এল দরজা লাগিয়ে দেওয়ার জন্য।
“রিনভী, দরজাটা লাগিয়ে দে।”
“হুম। সাবধানে যাবেন।”
“আচ্ছা। শোন…”
“জি?”
“কাল সকালে ভার্সিটি যাওয়ার সময় আমাকে একটা কল দিস। আমি ওইদিক দিয়েই যাব, তোকে নামিয়ে দেব।”
“আপনার তো উল্টো পথ।”
“সমস্যা নেই। বাসে যে ভিড় থাকে সকালে! কল দিস।”
“আচ্ছা।”
আহজার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। রিনভী দরজাটা আটকে দিয়ে কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। আহজারের পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। রিনভী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। কাল সকালে ম্যাথ পরীক্ষা। অনেক পড়া বাকি।
মাঝেমধ্যে জীবনের হিসাবগুলো অঙ্কের চেয়েও জটিল মনে হয়। অঙ্কের তো একটা নির্দিষ্ট সূত্র থাকে, কিন্তু জীবনের কোন সূত্র নেই। এখানে কখন যে কার সাথে কোন সমীকরণ মিলে যায়, তা কেউ বলতে পারে না। রিনভী বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে ভাবল, আহজারের মতো মানুষদের জীবনটা বড্ড কঠিন। এরা নিজের জন্য বাঁচে না, বাঁচে অন্যদের জন্য। আর এই অন্যদের জন্য বাঁচতে গিয়েই এরা নিজেদের স্বপ্নগুলোকে গলা টিপে হত্যা করে।
বাইরে তখন ঝিরঝিরে বাতাস বইতে শুরু করেছে। চৈত্র মাসের এই গুমোট গরমে এই একটুখানি বাতাস যেন আশীর্বাদের মত। রিনভী জানালার গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। কালকের সকালটা হয়ত নতুন কোন সমীকরণ নিয়ে আসবে। হয়ত বা পুরনো সমীকরণগুলোই নতুন করে মেলাতে হবে। কে জানে!
[বিঃদ্রঃ গল্পটা খুব সাধারণ একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের। এখানে কোন রূপকথার রাজপুত্র নেই, নেই কোন জাদুকরী সমাধান। আছে শুধু বাস্তবতার কশাঘাত আর বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। আহজার আর রিনভীর মত চরিত্রগুলো আমাদের আশেপাশেই ছড়িয়ে আছে। এরা নীরবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যায়, কোন অভিযোগ ছাড়াই। এদের জীবনে প্রেম আসে খুব সন্তর্পণে, দায়িত্ববোধের আড়ালে লুকিয়ে। আমি চেষ্টা করেছি সেই লুকিয়ে থাকা অনুভূতিগুলোকে একটু ছুঁয়ে দেখার। আশা করি আপনাদের ভাল লাগবে। ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।]লেখক পরিচিতি : সামিরা হিমু
সামিরা হিমু—শব্দের কারিগর কিংবা এক নিভৃতচারী স্বপ্নচারী। যাঁর পৈতৃক নিবাস বরিশালের গলাচিপার নোনা জলে সিক্ত হলেও, শৈশব আর কৈশোরের বেড়ে ওঠা এই যান্ত্রিক ঢাকার ব্যস্ত অলিগলিতে। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর অপেক্ষায় থাকা এই তরুণী বয়সে নবীন হলেও তাঁর ভাবনার জগৎটা বেশ গভীর আর বিস্তৃত। ২০২২ সালের এক ধূসর বিকেলে হুট করেই শব্দদের সাথে সখ্যতা শুরু। প্রথম দিকে ফেসবুকের পাতায় ছোট ছোট অনুভূতির আল্পনা আঁকতে আঁকতে আজ তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন প্রতিশ্রুতিশীল লেখক হিসেবে। তাঁর কলম কখনো মনস্তাত্ত্বিক জটিলতায় পথ হারায়, কখনো বিরহের নীল রঙে নিজেকে রাঙায়, আবার কখনো সামাজিক বাস্তবতার রূঢ় চিত্র কিংবা থ্রিলারের রোমাঞ্চকর মায়াজালে পাঠককে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে। প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের জাদুকরী গদ্যের মায়ায় আচ্ছন্ন সামিরা হিমু বিশ্বাস করেন, শব্দই পারে মানুষের না বলা কথাগুলোকে জীবন্ত করে তুলতে। তাঁর কাছে লেখালিখি কেবল শখ নয়, বরং এক অপরিহার্য অস্তিত্ব। তিনি মনে করেন— "লেখা আমার কাছে নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো।" নিঃশ্বাস বন্ধ হলে যেমন জীবন স্তব্ধ হয়ে যায়, কলম থামলে তাঁর ভাবনার জগৎটাও যেন ঠিক তেমনই স্থবির হয়ে পড়ে। যৌথ সংকলন 'জলতরঙ্গের অপ্রকাশ' বইটিতে তাঁর শব্দের প্রথম পদচিহ্ন মুদ্রিত হয়েছে। বর্তমানে পড়াশোনার পাশাপাশি সমসাময়িক জীবনবোধের ওপর ভিত্তি করে উপন্যাস এবং অনুগল্পের এক বিশাল ক্যানভাস সাজাচ্ছেন তিনি। মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন, অব্যক্ত প্রেম আর জীবনের গূঢ় রহস্যগুলোকে সহজ ও সাবলীল ভাষায় ফুটিয়ে তোলাই তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য। আগামীর দিনগুলোতে তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে পাঠকদের হৃদয়ে এক চিলতে মায়া আর একরাশ মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিতে চান।

