লেখক : এ কে সরকার শাওন
চ্যালেঞ্জ স্কুলে ছুটির ঘণ্টা বাজামাত্র ছাত্রবৃন্দ ছুটাছুটি করে বের হ’ল। আগামীকাল থেকে গ্রীষ্মকালীন ছুটি শুরু তাই আজকে ওদের উচ্ছ্বাস একটু বেশি। ওরা পাঁচজনই পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। বাসা উত্তরখান মাজার এলাকায়। তাই একটি অটোরিকশায় উঠে গালগল্প করতে করতে এক পর্যায়ে কাউসার বলল, “এই চল আমরা অ্যাডভেঞ্চারে যাই।”
সকলে সমস্বরে বলে উঠল, “দারুণ!”
রনি: “কিন্তু যাব কোথায়?”
ওরা এই একটি বিষয়েই আটকে গেল। কথার ফাঁকে ড্রাইভার নাঈম, যে ওদের চেয়ে একটু বয়সে বড়, বলল, “তোমরা যেখানে যাও আমারে লগে লইয়া যাইও।”
জুনায়েদ বলল, “আপনি যেতে পারবেন কাজ ছেড়ে? আমরা সাত দিনের জন্য যাব।”
নাঈম: “যামুগা কাজকুজ ছাইড়া! লেহা পড় চালু রাখলে অহন আমি এইটে থাকতাম। তিন বছর ধইরা খালি কাজের উপরই আছি। আমগো কি কোন রেস্ট-রিক্রিয়েশন নাই!”
কাউসার: “আচ্ছা আপনি আমাদের সাথে যাবেন।”
সামির: “কিন্তু যামু কোথায়?”
জুনায়ে: “সুন্দরবনে গেলে কেমন হয়?” পাশে বসা সাবিরের কাঁধে থাপ্পড় দিয়ে বললো, “কি রে তুই কিচ্ছু বলসিস না কেন?”
সাবির: “ঘরের সব কাম কাইজ আমারই করতে হয়। ঘরে তোদের মত আপন মা নাই। সৎ মা সারাক্ষণ বকাঝকা ও মাইরের উপর রাখে। প্রতিদিন লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। আমি মনে হয় যেতে পারবো না।”
কাউসার: “তোর যেতেই হবে। পরেরটা পরে দেখা যাবে।”
নাঈম: :তুমি যাবাই। তোমার সৎ মা বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমাদের বাড়ি চলে আসবা। মনে করবা তুমি আমার ছোট ভাই। মা, তোমাকে দেখলে খুশি হবে। আমার বাবা নাই, তোমার মা নাই। কেমন একটা মিল আছে আমাদের।”
এতক্ষণ ধরে ওদের কার্যকলাপ আনন্দের সাথে পর্যবেক্ষণ করছিল রিনা আখতার নামে এক ভদ্রমহিলা ও শাওন কাদির নামে এক ভদ্রলোক। রিনা আক্তার চোখমুখে একরাশ নস্টালজিক ভাব নিয়ে বললেন, “তোমাদের এই বন্ধুত্ব অটুট যেন থাকে।”
ওরা ওদের কথাবার্তার মাঝে মশগুল হয়ে রইল।
শাওন কাদির বললেন, “তোমরা অ্যাডভেঞ্চারে কোথায় যাবে? এই বিষয়ে আমি তোমাদের সাহায্য করতে চাই।”
সকলে সমস্বরে বলল, “বলেন আঙ্কেল কোথায় যাওয়া যায়?”
সাবির তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি নিয়ে বলল, “কিন্তু আপনাকে তো চিনি না। একজন অপরিচিত লোকের কথায় কেন যাব আমরা?”
শাওন: “বেশ তো চিনে ও পরখ করে নাও। মেডিকেল রোডে মেডিকেলের সাথে আমার বাড়ি। কাল তোমরা এসো সবাই। আমার বাগানে বসে পরিকল্পনা করা যাবে।”
কাউসার: “আপনার বাড়ি আমাদের বাসার কাছেই। ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর দিন। আমরা আগামীকালই আসবো।”
যেই কথা সেই কাজ। অটোরিকশা ড্রাইভারসহ ওরা ছয়জন, সাথে আরও একজন বিশালবপুর ভদ্রলোকও এল। কাউসার এক দৌড়ে শাওন সাহেবের কাছে এসে কানে কানে বলল, “আঙ্কেল, এই মোটা লোকটি আমার জগলু মামা। মা স্পাই হিসাবে পাঠিয়েছেন। জগলু মামা লেখাপড়ায় সব জায়গায় ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, কিন্তু সব কাজে লাড্ডু! তবে ভাল কবিতা লেখেন।”
শাওন: “আচ্ছা আচ্ছা, আমি দেখছি বিষয়টি।”
শাওন সাহেব এগিয়ে গিয়ে জগলু সাহেবের সাথে করমর্দন করে পরিচিত হ’লেন। তিনি বললেন, “প্রিয় কমরেডগণ, কমরেড একটি ফরাসি শব্দ। এর অর্থ সাথী, বন্ধু, সহকর্মী বা সহযোদ্ধা। তোমরা যখন অ্যাডভেঞ্চারে যাবে, তখন একে অপরকে কমরেড বলে সম্বোধন করবে। এবার সকলে গোল হয়ে বসো। আমি তোমাদের অ্যাডভেঞ্চারের স্থান সম্পর্কে বিস্তারিত বলছি। এরপর সিদ্ধান্ত তোমাদের।”
সকলে গোল হয়ে মানচিত্র দেখতে লাগল।
“এই হচ্ছে পূর্বাচলের মানচিত্র। এটা ১০ নং সেক্টর। এখানে একটি স্কুল আছে, পশিহারা স্কুল। পাশে বিরাট মাঠ। উত্তর-পূর্ব কোণে বেশ ঝোপঝাড় ও ঘন গাছ-গাছালিতে ভরা জঙ্গলের মাঝে এটা আমার বাড়ি—শাওনাজ ভিলা। এর পূর্ব ও উত্তর দিকে বিশাল লেক রয়েছে। আমার বাড়িতে আলী আক্কাস নামের একজন বাবুর্চি কাম কেয়ারটেকার রয়েছে। সে তোমাদের রান্নাবান্না ও বাজার করে দেবে। পাঁচটি শোবার কক্ষ আছে, বড় ড্রয়িং-ডাইনিং ও বিশাল হলরুমও আছে। তোমাদের যাবতীয় খরচ আমার। জগলু ভাই, মানে তোমাদের জগলু মামা তোমাদের ক্যাপ্টেন।”
সবাই হাততালি দিয়ে জগলু মামাকে স্বাগতম জানালো। শাওন সাহেব আবার বলতে শুরু করলেন,
“কিন্তু একটি কথা আছে, বাড়িটিতে রাতে ভূতের উপদ্রব আছে বলে কিছু দুষ্ট লোক রটাচ্ছে। আলী আক্কাস রটাচ্ছে বাচ্চা ভূতের কান্নাকাটিও নাকি শোনা যায়।”
কথাগুলো শোনার পর সকলেই ভয়ে কাচুমাচু হয়ে গেল। রনি একেবারেই কুঁকড়ে উঠে বলল, “আমি ভূতকে খুবই ভয় পাই।”
জগলু মামা বললেন, “আরে ভূত বলতে কিছু নাই। বিজ্ঞানে ভূতের অস্তিত্ব নাই।”
শাওন: “না, ভূত মানে হ’ল, যা আছে তা-ই ভূত। লোকে বলে না, তিনি এই স্কুলের ভূতপূর্ব হেডমাস্টার ছিলেন। এর মানে তিনি পূর্বে এই স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। তিনি ছিলেন, এই থাকা বা অবস্থান করাটাই ভূত। অন্ধকারে কিচ্ছু নাই কিন্তু তুমি দেখলে একজন দাঁড়িয়ে আছে আসলে একটি কলাপাতা ছিল। এটা দৃষ্টি ভ্রম বা ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশন। এটাই ভূত দেখা।”
রনি: “আর ঐ যে বললেন ভূতের বাচ্চার কান্নার আওয়াজ?”
শাওন: “ওটাও হ্যালুসিনেশন, মানে শ্রবণ বিভ্রম । সারাদিন ভূত-ভূত ভাবলে রাতে তা শোনার অনুভূতি হয় – ইংরেজিতে যাকে বলে অডিও হ্যালুসিনেশন। আসলে কিচ্ছু না। তারপরেও তোমাদের সুবিধার জন্য স্থানীয় ওসি সাহেবকে জানিয়ে রাখব বিষয়টি। পাশের স্কুলের হেডমাস্টার নাজমা পারভীন আমার বন্ধু। ওনাকেও বলে দেব। ওই এলাকায় তোমাদের কোন সমস্যা হ’লে সবাই এগিয়ে আসবে। তবে আমি নিশ্চিত, তার আর দরকার হবে না। এখন ভেবে দেখ, তোমরা কী করবে।”
এমন সময় শাওন সাহেবের রাজকন্যা বর্ষা মা-মণি আসে নাস্তা নিয়ে।
শাওন: “এস বর্ষা মা-মণি।”
জগলু: “বর্ষা মা-মণির জন্য একটি তালি হয়ে যাক!”
সবাই হাততালি দিল। অতঃপর সকলে মিলে নাস্তা করল। পরে সিদ্ধান্ত নিল, ওরা সেখানে যাবে এবং কমপক্ষে সাতদিন থাকবে।
পরিকল্পনামত একদিন ওরা শাওন সাহেবের পিকআপে চড়ে দুপুর ১২টায় শাওনাজ ভিলায় উপস্থিত হ’ল। বাড়িটি মেইন রোডের একেবারে শেষ প্রান্তে, যেখানে লোকালয় শেষ হয়ে অরণ্যের নিস্তব্ধতা শুরু হয়েছে। ঘন গাছগাছালি আর অযত্নে বেড়ে ওঠা ঝোপঝাড়ের মাঝে বাগানবাড়িটির অবস্থান। বোঝাই যাচ্ছে এককালে এই বাড়িটি ছিল সুখের প্রতীক আর শান্তির নীড়। আজ তা বিবর্ণ অবস্থায় লতাগুল্মে ঢেকে গিয়ে এক ভূতুড়ে পরিবেশ তৈরি করেছে। বড় বড় পুরনো গাছগুলোর ডালপালা এমনভাবে বাড়িটিকে জাপটে ধরেছে, যে দিনের আলোতেও সেখানে এক জমাট অন্ধকার খেলা করে। ঝোপঝাড়ের আড়ালে ঢাকা পড়া বাগান থেকে মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব খসখস শব্দ ভেসে আসে, যা স্থানীয়দের মনে এক অলৌকিক বা ভূতুড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। বাতাসের শব্দে জীর্ণ পাতার মর্মর ধ্বনি আর মরিচাধরা জানলা কপাটের ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ মিলেমিশে এই নির্জন কোণটিকে এক রহস্যময় ও গা-ছমছমে আশ্রয়ে পরিণত করেছে। জগলু মামা বাড়িটি দেখে খুব খুশি। সকলেই যখন ছবি তুলতে ব্যস্ত, তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাড়িটি নিয়ে চার লাইন লিখে ফেললেন।
বাবুর্চি আলী আক্কাসের চেহারাটা ভয়ানক। নরকের আগুনে পোড়া কয়লাসম। চাহনিটা যেন কেমন ভীতিপ্রদ। জগলু মামা ওর চেহারার দিকে তাকিয়ে ভাবছেন। ব্যাটা দেখতে ঠিক যেন ব্রিটিশ লেখিকা এমিলি ব্রণ্টির ‘উইদারিং হাইটস’ উপন্যাসের নায়ক ও খলনায়ক হিথক্লিফের মত। তবে সে বাহ্যিকভাবে একদম চুপচাপ প্রকৃতির। এদিক থেকে চরিত্রটা উইলিয়াম শেকসপিয়ারের ট্র্যাজেডি ‘জুলিয়াস সিজার’-এর ক্যাসিয়াসের মত। জগলু মামা বললেন, “এই ক্যাসিয়াস, সরি আলী আক্কাস সাহেব, সবার মালপত্র ভেতরে নিয়ে রাখো। আর দুপুরের খাবার তৈরি তো?”
আলী আক্কাস হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়াল। জগলু মামা সকলকে ডেকে বললেন, “কমরেডস, তোমরা জেনে খুশি হবে। আমি এই বাড়ি নিয়ে চারটি লাইন লিখেছি। তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোন।
“শ্যামল গায়ে কুঞ্জছায়ে
জীর্ণ পর্ণকুটির!
নির্জন দিক সুখের প্রতীক
নিরব শান্তির নীড়!”
সবাই হাততালি দিল। মামা বললেন, “এবার কক্ষ বণ্টন। লেক সংলগ্ন উত্তর-পূর্ব কোণার কক্ষে, মানে ১ নং কক্ষে, আমি একা থাকব।”
রনি হাত উত্তোলন করল।
জগলু: “কী বলো?”
রনি: “মামা, আমি একা থাকতে পারব না।”
জগলু: “তা বেশ। তুমি ও কাউসার ৩ নং কক্ষে থাকবে। ওখানে দু’টো খাট আছে।”
জুনায়েদ: “মামা ২ নং কক্ষে কে থাকবে?”
জগলু: “ওটা ফাঁকা থাকবে, যাতে আমার ঘুমের কোন প্রকার ব্যাঘাত না ঘটে। ৪ নং কক্ষে থাকবে জুনায়েদ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম কক্ষে থাকবে নাঈম ও সাবির। ওরা দু’জন ভাই-ভাই, দুই খাটে দু’জন থাকবে। এখন চলো, সবাই লেকে গিয়ে গোসল করি।”
লেকে সকলেই গোসল করতে গিয়ে বিশাল বিপত্তি হ’ল। জগলু মামার ওজনে ভেজা লেকের পাড় দেবে মামা শো করে স্কাড ক্ষেপণাস্ত্রের মত পানিতে চলে গেল। নাঈম ও কাউসার কোনওমতে মামাকে টেনে তটের কাছে নিয়ে এল। কাউসার কিস অফ লাইফ দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে লাগল। নাঈম মামার পেটে দু’হাতে চাপ দিয়ে মুখ দিয়ে পানি বের করল। পশিহারা স্কুলের প্রধান শিক্ষককে মোবাইলে জানালে তিনি দ্রুত একজন চিকিৎসক পাঠালেন। তিন দিন আর কোন অঘটন ঘটেনি। ওরা এই তিন দিন ওদের মত করে হৈচৈ হুল্লোড় করে দিন পার করল। পালাক্রমে মামার খেয়াল রাখল। নিয়মিত ওষুধ সেবন করাল।
চতুর্থ দিন মামা বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। কাউসার কবিতা আবৃত্তি করল। নাঈম পল্লীগীতি শোনাল। সাবির ছবি আঁকল। রনি, জুনায়েদ ও সামির মাঠে ফুটবল খেলল। রাতে খাবার টেবিলে জগলু মামা বললেন, “আজ অমাবস্যা। অন্ধকারেও অসাধারণ সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। জানো, কে বলেছেন? কবি টি. এস. এলিয়ট ইস্ট কোকার কবিতায় বলেছেন:
So the darkness
Shall be the light,
And the stillness the dancing.
আমি রাত ১২টায় অন্ধকারে সৌন্দর্য দর্শনে বের হব। আছ কোন বীর এই অ্যাডভেঞ্চারে যুক্ত হবে?”
এমন সময় বাইরে কে যেন দৌড় দিয়ে চলে গেল বলে মনে হ’ল। নাঈম দৌড়ে বাইরে হয়ে দেখে কেউ নেই। সকলেই নীরব, তাই মামা বললেন, “ওকে, কেউ আমার সাথে বের না হ’লে কোন সমস্যা নেই। আমি একাই বের হব। কবিগুরু তো বলেই দিয়েছেন:
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে
তবে একলা চলো রে।”
রাত ১২টা। রনি ও কাউসার ছাড়া সবাই ঘুমে। ওরা দাবা খেলছিল। ২/২ ড্র। শিরোপা নির্ধারণী পঞ্চম রাউন্ডের খেলা চলছে। এমন সময় মামা বাইরে বের হ’লেন সৌন্দর্য দর্শনে। গভীর অন্ধকারে রাতের তারাগুলো জ্বলজ্বল করছিল। চারপাশে ঝিঁঝি পোকা ও ব্যাঙের ডাকে কান ঝালাপালা। মৃদুমন্দ বায়ে মামা গুনগুনিয়ে গান গাইছে। মামা বারান্দায় বসে লিখলেন
“নিশুতি রাতের গহীন আঁধার,
তারার আলোকমালা,
ঝিঁঝিঁ আর ব্যাঙের ডাকে
কান যে ঝালাপালা।
সমীরণের অনুরণনে দুলছে শাখা
সজীব হচ্ছে প্রাণ!
উদাসী মনে গান জাগছে ক্ষণে
আলোয় ভরছে মন।”
এর পর মামা হাঁটতে হাঁটতে বাগানের গভীরে গেল।
এদিকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর রনি শিরোপাজয়ী হ’ল। ওরা হাতমুখ ধুয়ে ঘুমাতে যাবে এমন সময় কাউসার বলল, “এই রনি, মামা কি ঘরে ফিরেছে?”
রনি: “মনে হয় ফিরে নাই।”
কাউসার: “জানালা দিয়ে একটু ঢুঁ মেরে দেখে আয় না?”
রনি মামার কক্ষে গিয়ে দেখল দরজা খোলা। মশারি টাঙানো, কিন্তু মামা নাই। ওরা দুজনের বাড়ির ভিতরে তন্নতন্ন করে মামাকে খুঁজে না পেয়ে বাইরে টর্চ মেরে মেরে মামাকে খুঁজতে লাগল। ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল। ওরা সকলকে ডেকে তুলল। সবাই ভয় পেয়ে গেল। সব আনন্দ ধূলিসাৎ হ’ল নিমিষেই। ওরা ৩ নং কক্ষে মিটিংয়ে বসল কী করণীয়। এমন সময় দরজা জানালায় বৃষ্টির মত ঢিল এসে পড়তে লাগল। ভূতের চিৎকার। বাচ্চা ভূতের কান্নার আওয়াজ অস্থির করে তুলল। কাউসার ঠোঁটে উলম্বভাবে তর্জনী রেখে ফিসফিস করে বলল, “চুপ! একদম চুপচাপ বসে থাক।” সে লাইট অফ করে দিল। কিছুক্ষণ পর ঢিল ছোঁড়া বন্ধ হ’ল। ভূতের আওয়াজ মিলিয়ে গেল। কাউসার বলল, “এগুলো ভূতের কাণ্ড নয়। এগুলো আসলে আমাদের ভয় দেখানোর জন্য দুষ্ট লোকের কাজ।”
নাঈম: “আমারও তাই মনে হয়।”
রনি: “আমাদের উচিত মামাকে খুঁজে বের করা।”
জুনায়েদ: “পুলিশকে খবর—”
কাউসার: “একদম না। পুলিশকে খবর দিলে জানাজানি হ’লে সব ভেস্তে যাবে। আশা করি মামার কিচ্ছু হয়নি। বড়জোর মামাকে আটকে রেখেছে। এরপর আমাদের ভয় দেখিয়ে গেল। আমি এখন বের হব। আমার সাথে জুনায়েদ যাবে। সব বাতি নিভিয়ে রাখতে হবে। নাঈম ভাই থাকেন বাড়িতে। সামির ১ নং কক্ষে, মানে মামার কক্ষের জানালা খুলে তীক্ষ্ণ নজর রাখো। সাবির ৪ নং কক্ষের জানালা খুলে নজর রাখো। বাড়ির উত্তর-পূর্ব দিকে আমার সন্দেহের তীর। নাঈম ভাই বাড়ির সব জায়গায় পা টিপে টিপে চলে লক্ষ্য করবেন কাউকে দেখা যায় কি না। রনি চুপচাপ শুয়ে থাকবি। কেউ একদম ভয় পাবি না। ভয় পেলে আমরা জয়ী হতে পারব না। আমরা ফিরে আসার পর পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করব।”
কাউসার ও জুনায়েদ অন্ধকারে বের হয়ে অসীম সাহসের পরিচয় দিল। কিন্তু কোন ক্লু বের করতে পারল না। ওরা বাড়ি এসে আবার মিলিত হ’ল। কাউসার বলল, “আগামীকাল আমরা স্বাভাবিক থাকব কমরেডগণ। মামা নিখোঁজ হওয়ার কোন ছাপ বা ভয়ের ছাপ থাকবে না আমাদের চেহারায়। আমরা এমনভাবে চলব যেন কিছুই হয়নি। Everything is normal. শুধু আলী আক্কাসের দিকে খুব সন্তর্পণে নজর রাখব। আগামীকাল রাত ১২টায় আমরা সকল বাতি নিভিয়ে সকল কক্ষের জানালার ফাঁক দিয়ে অবজার্ভ করব। ওরা যখন ঢিল ছুড়বে, তখনই আমি, জুনায়েদ আর নাঈম ভাই টর্চ নিয়ে বের হব। কি জুনায়েদ? কি নাঈম ভাই, বুকে সাহস আছে?”
ওরা দুজন মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত উত্তোলিত করে সমস্বরে বলল, “মরতে হয় মরব। কিন্তু পিছু হটব না কমরেড।”
রনি: “তোদের দুঃসাহস দেখে আমার বুকেও সাহস সঞ্চার হচ্ছে কমরেড।”
কাউসার: “সাব্বাশ কমরেড। এখন সবাই ঘুমাতে যাব।”
পরদিন রাত ১২টায় ওরা বাতি নিভিয়ে ঘুমের ভান করল। সকলেই জানালা ফাঁক করে দেখল কয়েকজন এসব করছে। এক ঝটকায় কাউসার, জুনায়েদ আর নাঈম দরজা খুলে উল্কার বেগে বের হ’ল। দরজায় দাঁড়ানো রনির ডান পায়ে একটি ইটের টুকরো পড়ল। সামির ও সাবির ওর যত্ন নিতে লাগল।
কাউসার, জুনায়েদ আর নাঈম একসাথে বের হওয়াতে ওরা উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে পালাল। ওরা তিনজন সেদিকে ধাওয়া করল। এগিয়ে দেখল জগলু মামার লাল-সবুজ রঙের ক্যাপ পড়ে রয়েছে।
জুনায়েদ: “ঘটনা এই দিকেই ঘটেছে।”
কাউসার: “আগামীকাল সকালে নাস্তার পর আলী আক্কাসকে ছুটি দিয়ে দেব। ওকে বলব, দুপুরের জন্য রূপগঞ্জের বিশেষ এক দোকান থেকে মুরগির গ্রিল আর নানরুটি কিনে আনতে। উদ্দেশ্য ওকে দীর্ঘক্ষণ বাড়ির বাইরে রাখা। তখন আমরা এই দিকটায় প্রহরী বসিয়ে চিরুনি তল্লাশি করব।”
পরদিন সামির ও সাবিরকে প্রহরী নিযুক্ত করে ইঞ্চি ইঞ্চি জায়গা খুঁজতে লাগল। ওরা কতগুলো স্তূপকৃত ডাল সরিয়ে একটি সরু সুড়ঙ্গ দেখতে পেল। নাঈমকে সুড়ঙ্গমুখে দাঁড় করিয়ে কাউসার ও জুনায়েদ ক্রলিং করে এগিয়ে গেল। অনেক দূর এগোনোর পর দেখল একটি স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ঘরে একটি লোক মদজাতীয় জিনিস পান করছে। সে বুঁদ হয়ে আছে। মোমের আলোয় তার পাশেই মামা কালো কাপড়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় একটি চেয়ারে বসা। সামনে খাবারের প্যাকেট। মামাকে আঁটোসাঁটোভাবে বেঁধে রেখেছে, মুখে কালো টেপ। কাউসার ও জুনায়েদ চুপচাপ ফিরে এল। সুড়ঙ্গ মুখ থেকে নাঈম ভাইকেও নিল।
ওরা বাড়ি এসে আবার মিটিংয়ে বসল। আজ সাড়ে ১১টায় নাঈম ভাই গিয়ে শাওন সাহেব, নাজমা ম্যাডামকে নিয়ে থানায় যাবেন। অটোরিকশা দিয়ে পুলিশ নিয়ে আসবেন ১২টায়। গাড়িতে বেশি শব্দ হ’লে অপারেশন পণ্ড হবে। তাই অটোরিকশা ব্যবহার।
রনি: “এই অপারেশনের কী নাম দেওয়া যায় কমরেড?”
জুনায়েদ: “যেহেতু রাত ১২টায়, তাই ‘অপারেশন জিরো আওয়ার’ নাম দেওয়া যেতে পারে।”
কাউসার: “ওকে, অপারেশন জিরো আওয়ার।”
পরদিন রাত ১২টায় আবার শাওনাজ ভিলায় ঢিল ছুঁড়ল। ভূতের চিল্লাপাল্লা শোনা গেল। এরপর সব চুপ। নাঈম ভাইয়ের অটোতে ও অন্য আরেকটি অটোতে চেপে শাওন সাহেব, নাজমা ম্যাডাম ও পুলিশ এল। সুড়ঙ্গের চারপাশে পুলিশ ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল। সুড়ঙ্গে ঢুকল দুজন সশস্ত্র পুলিশ। পেছনে কাউসার ও জুনায়েদ। স্পটে তিনজন গ্রেপ্তার। জগলু মামাকে উদ্ধার করল। চোখের বাঁধন খোলার সময় মামা বললেন, “একজন কবিকে এভাবে কেন আটকে রাখল, আমি তো এর বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারলাম না। যত্তসব গাধার দল।”
আসলে স্থানীয় সাবেক মেম্বার ফজু মিয়া কেয়ারটেকার আলী আক্কাসকে লোভ দেখিয়ে এবং আরও কয়েকজন ভাড়াটে লোক গভীর রাতে ভূতের নাটক সাজায়, যাতে শাওনাজ বাড়িটি পরিত্যক্ত হয় এবং ফজু মেম্বার বাড়িটি দখল নিতে পারে। তাদের কথামত আরও দুজন, মোট পাঁচজন আটক হ’ল। সবাইকে থানায় যেতে হ’ল। সাংবাদিক এল, ছবি তোলা হ’ল।
জিজ্ঞাসাবাদে ফজু মেম্বার, আলী আক্কাস গং তাদের অপরাধ স্বীকার করল। তারা জানাল যে, শাওন সাহেবের শাওনাজ ভিলা নামের বাড়িটি দখলের হীন উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন ধরে তারা এই ভূতের নাটক সাজিয়ে এলাকার মানুষকে ভয় দেখাত। এ ছাড়াও ওরা বিভিন্ন জমি দখলের সাথে জড়িত।
পরের দিন সকালে শাওনাজ ভিলায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হ’ল। সকালে পত্রিকার প্রথম পাতায় ওদের ছবি ও বীরত্বের গল্প ফলাও করে ছাপা হ’ল। শিরোনাম ছিল: “পূর্বাচলে সাহসী কিশোরদের বুদ্ধিমত্তায় প্রতারক চক্র গ্রেপ্তার: রাতারাতি হিরো পাঁচ বন্ধু”
এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং স্থানীয় থানার ওসি নিজে এসে এই পাঁচ কিশোর, ড্রাইভার নাঈম এবং জগলু মামাকে শুভেচ্ছা জানালেন। জগলু মামা বুক ফুলিয়ে বললেন, “আমি আগেই বলেছিলাম, ভূত বলে কিছু নেই, সবই দুষ্ট লোকের চক্রান্ত!”
সবাই তখন আনন্দে হাসিতে ফেটে পড়ল।
এই রোমাঞ্চকর অভিযানের পর ওরা শুধু স্কুলপড়ুয়া শিশুই রইল না, বরং তারা হয়ে উঠল অদম্য সাহসের প্রতীক।
লেখক পরিচিতি : এ কে সরকার শাওন
কবি ও কথাসাহিত্যিক

