মুক্তি

লেখক : অদিতি চ্যাটার্জি

বিকেলে নাটা গড়িয়া থেকে যখন ট্রেকারটা বসুবাটী স্টেশনের দিকে যাচ্ছে, দেখি খোলা আকাশ তার নীচে সবুজ ধান ক্ষেতের কোলাকুলির মাঝে ভিলেনের মত উঁকি মারছে এক খণ্ড কালো মেঘ। মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল “এই রে, কালবৈশাখী না ওঠে!” ট্রেকারের সহযাত্রীরাও এক সুরে রা কাটছেন, “চন্ডীপুরে পৌঁছে যাই, তারপরে যা খুশি হোক বাবা। মাঝ রাস্তায় ঝড় উঠিস না।” সে যাই হোক, বসুবাটী বাজারে ট্রেকারটা নামিয়ে দিয়ে চলে গেল, সামান্য হেঁটেই স্টেশন। জোর কদমে চলার আগে আগেই ধুলোর ঝড় দেখা দিলেন। বসুবাটী স্টেশনটা বর্ধমান কর্ড লাইনের একটা ছোট্ট স্টেশন, দু’টো মোটে প্ল্যাটফর্ম। তাড়াতাড়ি লাইনটা পার হয়ে দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে উঠতেই প্রবল প্রতাপ নিয়ে কালবৈশাখী এসে গেল। ছাউনির কাছে পৌঁছতে চাইছি, কিন্তু ঝড়টা আমাকে হয় পিছনে টানছে, নাহলে লাইনের দিকে ঠেলছে। এই আটান্ন বছরের জীবনে কালবৈশাখী ঝড়ের এইরকম প্রবল বিক্রম রূপ প্রথমবার দেখা, সত্যি ভয় পেয়ে গেছি। হঠাৎ দেখি আমার ডানহাতের কবজিটা রোগা, কালো মত বছর চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশের একজন মানুষ চেপে ধরেছে।
“দাদা, আসুন। কিচ্ছু হবে না।”
সিমেন্টের বসার জায়গার কাছে দাঁড়িয়েছি, দেখি আমার সহযাত্রী আমাকে চেপে ধরে বসাচ্ছেন। “আসলে এত খোলা জায়গা তো, ঝড়ের দাপট খুব বোঝা যায়।
এ কী আপনাদের শহর! কালবৈশাখী হ’ল বুঝলাম গোটা কত গাছ ভেঙে পড়া দেখে।”
না, আমি কোন উত্তর দিতে পারছিলাম না, বুকের ভেতরে তখন রেলগাড়ি দৌড়াচ্ছে। তবু হাসলাম।
“দাদা কী কারুর বাড়িতে এসেছিলেন?”
বুঝলাম আমার সহযাত্রী গল্প করতে ভালবাসেন। প্রবল ঝড় আর মুষলধারে বৃষ্টি তাঁর মন ভরাতে ব্যর্থ। বললাম, “ওই নাটাগড়িয়াতে এক বন্ধুর বাড়িতে এসেছিলাম। আপনিও কি এদিকেই থাকেন?”
“নাটাগড়িয়া ছাড়িয়ে দাদা গঙ্গাধর পুরে থাকি। এই বৌ-মেয়ে নিয়ে কুটুমবাড়িতে যাব। স্টেশনে চলে আসার পর ঝড়টা শুরু হ’ল।”
দেখি অন্য একটা সিমেণ্টের বেঞ্চে মা-মেয়ে জড়িমড়ি হয়ে বসে। আলো খুব কম, তার ওপর ধোঁয়ার মতো বৃষ্টি, ওরা পুরো পুঁটুলি হয়ে গিয়েছে। বৃষ্টির ছাঁট আর জোলো হাওয়ায় আমারও শীত-শীত করছে, ভাবলাম একটা সিগারেট খাওয়া যাক। লাইটারটা হাতে নিয়েছি , শুনি সহযাত্রী বলছেন , “দাদা ধোঁয়াটা যদি… আসলে আমার একটু শ্বাসের সমস্যা আছে।”
সত্যিই লজ্জিত হই, “সরি সরি…”

বৃষ্টির বেগটা একটু কমেছে। তবে সাড়ে ছ’টার বর্ধমান লোকালের কোন ঘোষণা নেই। এমনিতেই কর্ডের ট্রেন লেট করে, তার উপর আজ মারাত্মক ঝড়বৃষ্টি! ভিতরে ভিতরে একটা টেনশন যখন চলছে, সেই সময় শুনি সহযাত্রী বলছেন, “দাদা কী করেন?”
উত্তর দিই, “দোকান আছে, ঘড়ি সারানোর। আপনি কী করেন?”
সহযাত্রী একবার বৌ-মেয়ের দিকে তাকান, আমিও তাকাই। ওরা ওই রকম ভাবেই বসে। নড়াচড়া করেছে বলে তো মনে হয় না।
“আমি ঐ হাওড়ার দিকে জরির কারখানায় কাজ করতাম, জানেন? ভোরে বেরিয়ে যেতাম। নাটাগড়িয়া থেকে সাড়ে ছ’টার বাস ধরে চলে যেতাম। বাড়ি আসতে আসতে সেই রাত ন’টা বাজত।”
“আচ্ছা। তা আপনাদের হুগলি তো খুবই ফলনশীল জায়গা।” মুখ ফসকে বলে ফেলি, “আপনার জমি নেই?”
বলেই মনে মনে জিভ কাটছি আর কান মুলছি। কিন্তু সহযাত্রী বলছেন, “আমাদের তো জমি নেই। বাড়ির গা লাগোয়া ছোট্ট জায়গায় বৌ পুদিনা পাতা, একটু বেগুন গাছ বসাত, লাউও করেছিল একবার। ও-ই গিয়ে নাটাগড়িয়া বাজারে বেচে আসত। দাদা নাটাগড়িয়া বাজারটা দেখেছেন? খুব বড় বাজার।”
সহযাত্রী একটু থামেন, বৃষ্টি এখন টুংটাংভাবে পড়ছে। একটু উঠে দেখি সিগন্যাল এখনও লাল। সহযাত্রীর কাছে ফিরে গেলাম, কৌতূহলবশে জিজ্ঞাসা করলাম, “আজ রবিবার বলে কি ছুটি?”
সহযাত্রী কি হাসলেন? বোঝা গেল না। বলে উঠল, “কোভিড জানেন দাদা, সব খেল। সবার আগে চাকরিটা। লকডাউন উঠে যাওয়ার পর বলল বাজার খারাপ, এত লোক লাগবে না। দরকার মনে হলে ফোন করে দেব। তো মালিকের ফোনের অপেক্ষায় বসে থাকলে তো পেট চলবে না, বর-বৌ গেলাম ইটভাটার কাজে। আমাদের হুগলির এই জায়গায় বেশ কয়েকটা ইটভাটা আছে । আপনার ওই নাটাগড়িয়া যাওয়ার পথেই পরে ইটখোলা। দেখেছেন দাদা?”
আমি কিছু বলার আগেই সহযাত্রী বললেন, “সেখানেই যেতাম। মেয়ে তো স্কুলে যেত মিড-ডে মিলে ওর খাওয়া একবেলা ভালই হত। আমরাও আবার একটু একটু করে চলতে শুরু করলাম। বৌয়ের লাগানো পেঁপে গাছটাতে জানেন কুষি কুষি কত পেঁপে এসেছিল। আমি বললাম, বাজারে সব দিয়ে দিও না এইবার, বাড়ির জন্য একটা রেখো । পেঁপের ডালনা, পেঁপের চাটনি – কত দিন খাইনা।” ফিক করে হাসলেন সহযাত্রী।
“তারপর?” গপ্পে মানুষটার এই যখন-তখন চুপ করে যাওয়াটাই অসহ্য লাগছে।
“তারপর আর কিছু নেই দাদা। শীতের সময় ছিল দুইজনে তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসছিলাম। সবার আগে একটা গোয়ালঘর আসে, সেটা পেরিয়ে বাঁশঝাড়, তার গা লাগানো পুকুর। তারপাশেই আমাদের ঘর। ইটের খোয়া ফেলা সরু পথ, আপনি পাশাপাশি হাঁটতেই পারবেন না। ওটা দিয়ে আমরা ফিরি তাড়াতাড়ি হয় বলে। সেদিন যখন বাঁশবনে ঢুকি দেখি মেয়ে পড়ে আছে। বোধহয় দু’টো কী তিনটে হায়না ওকে খাওয়ার চেষ্টা করেছিল।”
আমি আঁতকে উঠি। কীসব আলফাল বকছে! গ্রাম হলেও এখানে জঙ্গল নেই, হায়না আসবে কোথা থেকে? বিরক্তি নিয়েই বলি, “ভাই, হায়না আসবে কোথা থেকে? জঙ্গল তো নেই এখানে?”
“হি হি…” সহযাত্রীর হাসি ভেসে আসল যেন! “হায়না শুধু জঙ্গলে কেন, আমাদের মধ্যেও থাকে। দেখেননি? বাইকে চড়ে, সুন্দর জামাকাপড়, কালো চশমা পরে ঘুরে বেড়ায়?”
শিরদাঁড়াটা দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গে। কী বলছে ও? কী হয়েছিল ওর মেয়ের?
“তারপর আর কী! বেরিয়ে পড়লাম আমরা তিনজনে মিলে। কখনও খালের ধারে, তো কখনও হাইওয়েতে। তারপর চলে এলাম এই রেল স্টেশনে। রাত কত হ’ল দেখিনি, তবে ভোঁ শুনছিলাম ট্রেনের। তার মানে এক্সপ্রেস ট্রেন আসছে। প্যাসেঞ্জাররা ভোর রাতে হাওড়া পৌঁছে যাবে, সেখান থেকে নিজেদের পথে। আমরাও চলে যাব আমাদের পথে…”
বলতে বলতে সহযাত্রী আচমকাই আমাকে ছোট্ট ধাক্কা মেরে বলে, “দাদা, ওই দেখুন ট্রেন আসছে।”

খেয়ালই করিনি ট্রেনটাকে। হলুদ আলোটা অনেকটাই কাছে তখন, দেখি আমার সহযাত্রী আর তাঁর পরিবার সেই হলুদ আলোর মধ্যে কীভাবে যেন টুকরো টুকরো হয়ে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। মাথাটা টলে গেল, প্ল্যাটফর্মে এখন সামান্য কিছু লোক আছে, ওরা দেখল না? কামরাটা প্রায় সামনে এসে থেমেছে, একটু ছুটেই পাদানিতে পা রাখি। টের পাই, ভেজা হাওয়াতেও কপাল দিয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। ট্রেন এইবার চলতে শুরু করল, শান্তি অবশেষে।

আচমকাই কানে আসল সহযাত্রীর গলাটা, “না দাদা, লড়াই করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। তাই এইভাবেই মুক্তিটা খুঁজে নিলাম।”


লেখক পরিচিতি : অদিতি চ্যাটার্জি
আমি অদিতি চ্যাটার্জি অল্প কিছু গল্প লিখেছি, শব্দ রেণু প্রকাশনী তাদের বৈশাখের ত্রৈমাসিক সংখ্যা য় আমার একটা লেখা প্রকাশ হয়েছে " আহ্লাদিনী রাধে " বলে। পাঠক হিসাবে আমার সব ধরনের লেখা পড়তে ভালো লাগে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up