পবিত্র ভালোবাসার ওম

লেখক : অর্দ্ধেন্দু গায়েন

ভক্ত ঘোষ আর তার সাড়ে চার বছরের একরত্তি মেয়ে রিদ্ধি। এই দু’জনকে নিয়ে ঘোষবাড়িতে প্রতিদিন যেন একটা আস্ত সিনেমা চলে। রিদ্ধি যেমন মিষ্টি, তেমনই ডানপিটে। আর ভক্তবাবু? তিনি অফিসের গম্ভীর অ্যাকাউণ্টস ম্যানেজার। বাড়ির চৌকাঠ পেরোলেই মেয়ের আজ্ঞাবহ দাস! তাদের দিন শুরু হয় খুনসুটি দিয়ে, আর শেষ হয় এক অদ্ভুত মায়াবী আদরে।

সেদিন ছিল রবিবার। সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। ভক্তবাবু একটু শান্তিতে চায়ে চুমুক দেবেন বলে খবরের কাগজটা মেলে ধরেছেন, ঠিক তখনই ছন্দপতন। ধপাধপ পা ফেলে ড্রয়িংরুমে হাজির রিদ্ধি। তার পরনে একটা বড়দের ওড়না জড়ানো, আর এক পায়ে টলমল করছে মায়ের হাই হিল জুতো।
“বাবা! আমি আজ রানু মণ্ডল হয়েছি। গান শোনো!” রিদ্ধির ঘোষণা।
ভক্তবাবু চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে হেসে ফেললেন, “তাই নাকি? তা রানু মণ্ডলজি, আমার চা খাওয়া পর্যন্ত একটু অপেক্ষা করা যাবে না?”
“উঁহু! আর্টিস্টদের নো ওয়েটিং!” কোমরে হাত দিয়ে রিদ্ধির জবাব। পাকা পাকা কথাগুলো সে কোথা থেকে শেখে, তা ভক্তবাবু আজও উদ্ধার করতে পারেননি। অগত্যা কাগজ নামিয়ে ভক্তবাবুকে শ্রোতার আসনে বসতে হলো। রিদ্ধি চোখ বন্ধ করে, হাত নেড়ে গাইতে শুরু করল তার নিজের তৈরি এক অদ্ভুত গান, “আকাশেতে মেঘ করেছে, বাবা কেন চা খেয়েছে, আমায় কেন ক্যাডবেরি দেয়নি…”
গান শেষ হতেই ভক্তবাবু জোরে জোরে হাততালি দিয়ে উঠলেন, “বাহ্‌! তা ক্যাডবেরির দাবিটা তো গানে গানে বেশ ভালই জুড়লে মা!” রিদ্ধি খিলখিল করে হেসে বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এই একটা জায়গায় ভক্তবাবু বড্ড দুর্বল। মেয়ের ওই নরম স্পর্শ আর চকোলেট-মাখা হাসিটার সামনে পৃথিবীর সব নিয়মকানুন হেরে যায়।

দুপুরের দিকে শুরু হ’ল আসল যুদ্ধ। রিদ্ধিকে ভাত খাওয়ানো মানে মহাভারতের যুদ্ধ। মা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন, “এই শুনছ, রিদ্ধিকে একটু খাইয়ে দাও না, ওবেলা আমার অনেক কাজ।”
ভক্তবাবু বাটি হাতে মেয়ের সামনে বসে পড়লেন। রিদ্ধি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল, “আমি খাব না। পেট পপকর্ন হয়ে গিয়েছে!”
“পেট পপকর্ন মানে কী রে?” ভক্তবাবু অবাক।
“মানে পেটে বাতাস ভরে গেছে, ভাত ঢোকার জায়গা নেই।” রিদ্ধির চটজলদি যুক্তি।
ভক্তবাবু দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি মাখানো ভাতগুলো মেয়ের মুখের কাছে নিয়ে বললেন, “আরে, এটা তো সাধারণ ভাত নয়। এটা হলো রকেট! এই দেখো, রকেট এখন উড়বে… ঘুঁউউউঁ… আর সোজা গিয়ে ল্যান্ড করবে রিদ্ধি-গ্রহের গুহায়!”
গল্পের ছলে রিদ্ধির হাঁ করা মুখের ভেতর ‘রকেট’ ঢুকে গেল। এইভাবে মেঘ-রাজার গল্প, ডানাওয়ালা ঘোড়ার গল্প করতে করতে কখন যে বাটির সব ভাত শেষ হয়ে গেল, রিদ্ধি নিজেই টের পেল না। খাওয়া শেষে রিদ্ধি বাবার গালে একটা জবরদস্ত চুমু খেয়ে বলল, “বাবা, তুমি খুব ভাল পটল (পাইলট)!” ভক্তবাবু হেসে আদরের সঙ্গে ওর নাকটা টিপে দিলেন।

পরের দিন সোমবার। সকালটা ছিল ঝলমলে। ভক্তবাবু রিদ্ধিকে নিয়ে সাইকেলে চড়ে বেরোলেন রিদ্ধির বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে। এবার সে কে.জি. ওয়ান। সকাল ৯:২০-তে তার স্কুলের প্রার্থনা শুরু হয়। বাবার সাইকেলের সামনে ছোট্ট একটা রবারের সিট বসানো আছে, রিদ্ধি সেখানে বসলেই মনে হয় যেন কোন রাজকন্যা রথে চেপেছে।
সাইকেল এগিয়ে চলল পাড়ার মোড় পেরিয়ে বড় রাস্তার দিকে। ভক্তবাবু বেশ জোরে জোরেই প্যাডেল করছেন। আচমকা তিনি খেয়াল করলেন, রিদ্ধি বড্ড চুপচাপ হয়ে গেছে। সাধারণত যে মেয়ে সাইকেলে উঠলেই পাখির মত কিচিরমিচির করে, সে আজ গম্ভীর। শুধু তাই নয়, সে বারবার ঝুঁকে পড়ে ভক্তবাবুর পায়ের দিকে তাকাচ্ছে।
“কী হলো রে মা? কোন পাখি দেখতে পেলি?” ভক্তবাবু সাইকেলের গতি একটু কমিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
রিদ্ধি কোন উত্তর দিল না। সে হুট করে তার দুটো পুচকে হাত দিয়ে ভক্তবাবুর একটা হাঁটু শক্ত করে চেপে ধরল। ভক্তবাবু অবাক হয়ে সাইকেলটা রাস্তার ধারে দাঁড় করিয়ে দিলেন, “কী হয়েছে মামণি? নামবে?”
রিদ্ধির চোখে তখন জল টলমল করছে। সে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “বাবা, তুমি আর সাইকেল চালিও না। তোমার পায়ে খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না?”
“কষ্ট হচ্ছে! কে বলল?” ভক্তবাবু আকাশ থেকে পড়লেন।
“আমি তো দেখতে পাচ্ছি!” রিদ্ধি বাবার পায়ের পেশিগুলো নিজের নরম হাত দিয়ে টিপে দিতে দিতে বলল, “তুমি যখন জোরে জোরে ওই গোল চাকাটা ঘোরাচ্ছ, তোমার পা-টা কেমন কাঁপছে। তোমার খুব লাগছে, না বাবা? চলো, আমরা হেঁটেই স্কুলে যাই।”

সাড়ে চার বছরের মেয়ের এই অবুঝ কিন্তু গভীর ভালবাসা দেখে ভক্তবাবুর চোখের কোণটাও কেমন যেন ভিজে উঠল। যে মেয়ে নিজের চকোলেটের ভাগ কাউকে দিতে চায় না, সে আজ বাবার পায়ের সামান্য পরিশ্রম দেখে কেঁদে ফেলেছে! ভক্তবাবু সাইকেল থেকে নেমে রাস্তার ধারেই হাঁটু গেঁড়ে বসলেন। রিদ্ধির চোখের জলটা মুছিয়ে দিয়ে বললেন, “আরে বোকা মেয়ে! এতে বাবার একটুও কষ্ট হয় না। বিশ্বাস কর মা,আমার খুব আনন্দ হয়। তুমি সামনে বসলে এই সাইকেলটা না ডানা মেলে আকাশে ওড়ে!”
রিদ্ধি তাও বিশ্বাস করতে পারল না। সে বাবার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিজের ছোট্ট ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে ভক্তবাবুর পা দুটো জোরে জোরে দাবাতে শুরু করল। যেন তার ওইটুকু হাতের ছোঁয়ায় বাবার সব ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে যাবে। ভক্তবাবু আর সাইকেলে উঠলেন না। মেয়েকে একহাতে কোলে তুলে নিলেন, আর অন্যহাতে সাইকেলের হ্যাণ্ডেল ধরে হেঁটে হেঁটেই স্কুলের পথ ধরলেন। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় পৌঁছেও গেলেন মেয়ের স্কুল “সোনারপুর শিশুনিকেতন”-এ। রিদ্ধি বাবার কাঁধে মাথা রেখে তখন শান্ত, কারণ এখন আর তার বাবার পায়ে ‘কষ্ট’ হচ্ছে না।

ছুটি হলে বাবা ও মেয়ে পায়ে হেঁটেই বাড়ি ফিরে এল। বিকেলের দিকে বৃষ্টি নামল ঝমঝমিয়ে। লোডশেডিং হয়ে চারদিক অন্ধকার। ড্রয়িংরুমে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে বসেছেন ভক্তবাবু। রিদ্ধি তখন ভয়ে ভুতু সেজে বাবার পিঠে এসে চড়ে বসল।
“বাবা, ভূত আসবে না তো?” রিদ্ধির গলা কাঁপছে।
ভক্তবাবু মেয়ের ছোট্ট ছোট্ট হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন, “আরে, ভূত আসবে কোন সাহসে? তোমার বাবা থাকতে কোন ভূত তোমার কাছে আসতে পারে? আমি এক ফুঁয়ে সব ভূত তাড়িয়ে দেব।”
রিদ্ধি বাবার চওড়া পিঠে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল, “বাবা, আমি যখন বড় হব, তখনও তুমি আমার ভূত তাড়িয়ে দেবে তো?”
ভক্তবাবুর বুকটা এক অজানা মায়ায় ভারী হয়ে উঠল। তিনি মেয়েকে কাঁধ (পিঠ) থেকে নামিয়ে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। ঘরের দেওয়ালে মোমবাতির আলোয় বাবা আর মেয়ের যে ছায়াটা পড়ল, তাতে কোন দূরত্ব ছিল না। ভক্তবাবু মেয়ের কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে মনে মনে বললেন, “তুই যত বড়ই হয়ে যা না কেন মা, এই বাবার কাঁধটা সবসময় তোর জন্যই থাকবে।”

বাইরে তখন বৃষ্টির শব্দ, ঘরের ভেতরে এক বাবা আর তার ছোট্ট রাজকন্যার নিঃশব্দ, পবিত্র ভালবাসার ওম। বৃষ্টির শব্দ আরও জোরালো হচ্ছে, আর ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে এক পবিত্র ভালবাসার আবেগঘন উষ্ণতা। সময়ের নিয়মে রিদ্ধি হয়ত একদিন বড় হবে, বদলে যাবে তার চারপাশের চেনা জগৎ। কিন্তু কোন এক বৃষ্টিভেজা অন্ধকারে, বাবার এই চওড়া পিঠ আর ভরসার চাদরটা তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হয়েই থাকবে। কারণ, মেয়েরা যতই বড় হোক না কেন, বাবার কাছে তারা চিরকালই সেই ‘রাজকন্যা’ হয়েই রয়ে যায়।


লেখক পরিচিতি : অর্দ্ধেন্দু গায়েন
জন্ম উত্তর চব্বিশ পরগনার যোগেশগঞ্জের মাধবকাটী গ্রামে।পেশায় সরকারী চাকুরী হলেও নেশা পড়াশোনা , ইচ্ছে হলেই লেখা-সে কবিতা, ছোটগল্প, অণুগল্প, প্রবন্ধ যা কিছু হতে পারে, অবসরে বাগান করা,ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা ইত্যাদি।তবে সব পরিচয়ের সমাপ্তি ঘটে সৃষ্টিতে --পাঠক যেভাবে চিনবেন আমি সেভাবেই থেকে যাবো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up