লেখক : অরিত্র চট্টোপাধ্যায়
স্মৃতির মত মেঘ জমেছে শহরের শরীরে…বর্ষার একঘেয়ে নাছোড় বৃষ্টির মত উদাসীন…ছিপছিপে বৃষ্টিভেজা রাস্তা…কালো কালো ছাতা কিম্বা ধূসর বর্ষাতিমোড়া মানুষ… ‘কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়’…
দার্জিলিং ম্যল থেকে গান্ধী রোড ধরে খানিকটা হেঁটে সার্কিট হাউস পেরিয়ে সামান্য একটু এগোলেই ভিলা এভারেস্ট হোটেল। একশ বছরেরও বেশি এ’ বাড়ির বয়স। হোটেল হয়েছে হালে, সম্ভবত আগে ছিল ব্রিটিশ কলকাতার মেয়রের গরমকালীন আবাস। আপাতত, এই বর্ষায়, আমাদের দিন দুয়েকের ঠাঁই।
হোটেল থেকে ম্যল-ফেরতা রাস্তায় হাঁটলে বাঁ হাতে হিমালয়ান টিবেট মিউজিয়াম। এক বিস্তীর্ণ সময়ের স্মৃতিকথা – তিব্বতের ইতিহাস-সংস্কৃতি-ধর্ম-যাপনরীতির কী বিপুল সম্ভার! অথচ কী বিপুল শূন্যতা! ভিজিটর্স বুক দেখলে বোঝা যায় কালেভদ্রে গুটিকয় মানুষ আসেন এখানে। ভাষা না বুঝলে একটা জাতির সংস্কৃতি অনেকটাই অধরা থেকে যায়। সেই অজ্ঞতাকে সঙ্গী করে, অনভিজ্ঞ চোখে ঘণ্টা দুয়েকের জরিপে যেটুকু ধরা পড়ল, তার জাবর কেটে গোটা একটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া চলে। মিউজিয়ামের ভেতরকার কাজকর্ম সামলাচ্ছিলেন নিশা তামাং। কথায় কথায় বলছিলেন বৌদ্ধধর্মকে কেন্দ্র করে তিব্বত ও বাংলার নিবিড় আদানপ্রদানের কথা। জানলাম এই মিউজিয়াম ও ইনস্টিটিউটের তিব্বতি ভাষা ও সংস্কৃতির শিক্ষক Dawa Tsering এর কথা। তাঁর লেখা বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে ভাষা শেখার আশা জিইয়ে রাখলাম মনে মনে…
Revolver – লিভারপুলে দানা বেঁধে ওঠা বিস্ময়-ব্যান্ড The Beatles এর সপ্তম অ্যালবাম। দার্জিলিং ম্যল সংলগ্ন গান্ধী রোডে ইউনিয়ন চ্যাপেলের পেছনে Revolver হোটেল – না জানা থাকলে চোখেই পড়ে না প্রায় – এরকম এক প্রবেশপথের অন্য পারে বিটলসে বুঁদ হয়ে থাকা এক স্বপ্নরাজ্য। John, Paul, George, Ringo, Brian (বিটলসের ম্যানেজার) – সেইসব রকিং গুবরেপোকাদের নামেই হোটেলের সব ঘর। অনাড়ম্বর পথ পেরিয়ে Revolver-এ ঢুকে পড়া প্রাতরাশের অভিলাষে। প্রথম দর্শনেই পলকহীন বিস্ময়! টেবিলে, দেওয়ালে, দরজায়… প্রশস্ত ড্রইং তথা ডাইনিং রুমের সমস্ত অণু-পরমাণু জুড়ে রয়েছে বিটলস-ভুবনের খণ্ডচিত্র…বই, অ্যালবাম, পোস্টার আরও কত কী! ইংলিশ ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে ইয়েলো সাবমেরিনে অবগাহন। ডুবে যাওয়া, ভেসে ওঠা… And we lived beneath the waves In our yellow submarine… We all live in a yellow submarine
কালের ঝড়ঝাপটা সামলে প্রায় শ’খানেক বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে দাস স্টুডিও। শুরুর আস্তানা মাউণ্ট প্লিজ্যাণ্ট রোড, পরে আড়েবহরে বেড়ে নেহরু রোডের ঠিকানায় স্থানান্তর। বলিরেখা পড়েছে যে-সময়ের গায়ে, সেই প্রায়-বিস্মৃত দার্জিলিং-স্মৃতি ধরা আছে তার ক্যামেরায়। এবার গিয়ে খানিকটা হতাশ হ’লাম অবশ্য। অনেক পুরনো ছবিই আর নেই। তার জায়গায় এসেছে নতুন ছবি, পোস্টকার্ড, বুকমার্ক ইত্যাদি। বদলে যাওয়া সময়ের হাওয়ায় বদলেছে তার বহিরাবরণ… অন্তরে অন্দরে হয়ত এখনও বিগতস্মৃতির চুল্লি জ্বলছে ধিকিধিকি…
স্বপ্নিল ও সোমদত্তা। পড়ন্ত বিকেলের আলোয় ঝকঝকে দুই তরুণ-তরুণীর সাথে আলাপ হ’ল অক্সফোর্ড বুকস্টোরে। নতুন পুরনো বই হাতড়ে ওরা খুঁজছে ভিন্টেজ দার্জিলিংয়ের গল্পকথা। দেখতে চাইছে শুরুর সময় থেকে আজকের রূপান্তরের রূপরেখা। উজানপথে, অজানাপথে পাড়ি দিয়ে এসে ওরা নোঙর ফেলবে বর্তমানের ঘাটে। গত-কালের নিরিখে চেখে দেখতে চায় আজ-কালকে। রিল-শর্টসের চকিত দুনিয়ায় এখনও অনেক genZ দীর্ঘ পথ হাঁটার খিদে নিয়ে ঘোরে, বিবর্তনের ঝটিতি স্রোতের বিপরীতে ‘আরশোলা’ হয়ে জেগে থাকে…!
কত শত বৌদ্ধ নিদর্শন, স্তূপ আজ কেবল ধ্বংসস্তূপ…শহরের স্মৃতি থেকে পরম যত্নে মুছে দেওয়া হয়েছে পুরনো সময়ের দাগ…হেরিটেজ বাড়িগুলো ‘দুর্ঘটনা’-র কবলে পড়ে অস্তিত্ব-সংকটে…এমন সব গল্প শোনাচ্ছিলেন সুমিত। অবজার্ভেটরি হিলটপে মহাকাল মন্দির চত্বরের এক পাশে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেছে মহাকাল বাবা গুম্ফার রাস্তা। আলাপ হ’ল গুহামুখে বসা তরুণ পুরোহিত সুমিতের সাথে। নয় প্রজন্ম ধরে ওদের বাস এই শহরে। দোর্জে-লিং মনাস্ট্রি, যা থেকে দার্জিলিং তার নাম পেয়েছে বলে অনেকের মত, আঠার শতকের শুরুর দিকে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সেই মনাস্ট্রি ছিল এখানেই…সে সব কথা শুনেছে সুমিত তার পূর্বজনেদের কাছে…শুনছিলাম আমরাও, শেষ বিকেলের ফুরিয়ে আসা আলোয়। অতীত থেকে উঠে আসা আলো পথ হারিয়েছে বিস্মৃতির কানাগলিতে। অল্প কিছু মানুষের জানায়-শোনায়-চেতনায় তার রেশ রয়ে গেছে আজও।
…স্মৃতি হাতড়াচ্ছিলাম আমরাও, গোল্ডেন টিপস টিট্টোরিয়া টি বুটিকের ছাতে বসে চা খেতে খেতে। স্প্রিং মুনলাইট টি। এক মিঠে-বদন তরুণী চায়ের পট, কাপ-প্লেট, ছাঁকনি আর বালিঘড়ি রেখে গেল আমাদের সামনে। বালিঘড়ি বলে দেবে ব্রুইয়িং এর সময়। বসন্ত-চাঁদের-চায়ের আমোদে মশগুল আমরা…রঙে গন্ধে নেশা লাগে শরীরে…অথচ যা দাম তাতে বারবার নেওয়াও এক বিড়ম্বনা। আমাদের অসহায়তা আঁচ করে কি না জানি না, মুশকিল-আসান হয়ে হাজির সেই তরুণী। স্মিত হাসির সাথে চায়ের পট রিফিলড হয়ে এল নিমেষে। এমনই অনাবিল আন্তরিকতার আহ্লাদ পেয়েছিলাম আমরা, বছর সাতেক আগে, লাইট ইন হোমস্টে-তে। ভুটিয়া বস্তির রাস্তা ধরে কিলোমিটার খানেক হেঁটে গেলে সেই হোমস্টে, যেখানে আমরা জনা পাঁচেক বন্ধু এসে উঠেছিলাম ২০১৯ এর মে মাসে। এবারে এসে, ‘স্মরণের আবরণে’ ঢাকা পথে হেঁটে আমরা ফিরে যেতে চাইছিলাম পুরনো দশকের দিনগুলোর কাছে। শান্ত এবড়োখেবড়ো পথ প্রায় একইরকম আছে, বদলে গেছে আশপাশের ছবি। পুরনো হতশ্রী অস্তিত্বের পাশে নতুনের অস্বস্তিকর প্রগলভ প্রকাশ। আমাদের থমকে থাকা মুহূর্তগুলো মুহুর্মুহু ভেঙে যাচ্ছে স্কুটি-বাইকের অহরহ আর্তনাদে। পথের রেলিং, কিছু রংচটা দোকান আর বৌদ্ধগুরু পদ্মসম্ভবের কল্যাণে অবশেষে খোঁজ পাওয়া গেল তার। হোমস্টে আর নেই…অবসন্ন বাড়িটা একাকী দাঁড়িয়ে আছে ধুলোমাখা সাইনবোর্ড আর আমাদের হুল্লোড়স্মৃতিকে সঙ্গী করে।
দার্জিলিঙে আসা এবং ফিরে যাওয়া। আনন্দ-বিষাদ-মায়া মাখা এক যাতায়াতপথ। এমন নয় যে অনেকবার এসেছি এ শহরে, তবু যেন কী নিবিড় নাড়ির যোগ। পরিমলবাবু, আপনি লিখেছেন, “মাথার ভেতরে শেলি কীটসরা না থাকলে দার্জিলিংটা রাখতাম কোথায়?”* আপনার কথা খুব মনে হচ্ছিল, দার্জিলিং-ফেরতা কার্সিয়াঙের ডাও হিলে পাইনের সস্নেহ ছায়াভরা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে…যখন অজস্র বাজে বকবক, সদাশঙ্কিত মায়ের ‘বাবু…ওদিকে যেও না’ আর্তস্বর ছাপিয়ে কানে আসছিল একদল কলেজপড়ুয়ার আত্মমগ্ন কণ্ঠের উচ্চারণ..
I stood tip-toe upon a little hill, The air was cooling, and so very still… অথবা I wandered lonely as a Cloud
… বারবার ফিরে আসতে সাধ হয়…বর্ষায় গাভীর মত মেঘের চলাচল, সাদা কুয়াশার ভেতরে পথ হারানোর নেশা কিম্বা মেঘের দরজা খুলে একঝলক হঠাৎ-বেরিয়ে-আসা রোদে আতপস্নানের আশায়।
তথ্যসূত্রঃ
* দার্জিলিং: স্মৃতি সমাজ ইতিহাস – পরিমল ভট্টাচার্য
লেখক পরিচিতি : অরিত্র চট্টোপাধ্যায়
জন্ম মালদায় হলেও জন্ম বা কর্মসূত্রে সেরকম মাল-দার হওয়া গেল না যখন, তখন মাল বা ঐশ্বর্যের সন্ধানে সময় কাটে বই পড়ে, গান শুনে, একটু-আধটু আবৃত্তি-চর্চায়। তারই ফাঁকে ফাঁকে খাতায় চলে হিজিবিজি কাটা, সে অবিশ্যি শেষ অব্দি লেখা হয়ে ওঠে কি না সে বিচারের দায় লেখকের নয়।

