লেখক : জয়শ্রী পাল
১
মন্দ কাটছিল না একাদশ পেরনো দিনগুলো। অঙ্ক-পদার্থবিদ্যার রহস্যময় চোরাকুঠুরিতে সহজ আলো ঢেলে দিচ্ছিল শৌভিককাকু – শৌভিক দেবনাথ, রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের শিক্ষক। বাবার পূর্ব পরিচয়ের খাতিরে রূপদীপ কাকু বলে ডাকে। ওর দেখাদেখি শ্রীজিত-তমালও।
চলছিল তো দিব্যিই। বাধ সাধল তমালটা। বলা নেই, কওয়া নেই, দুম করে আসা বন্ধ করে দিল। রূপদীপ-শ্রীজিত আর শ্রীজিত-রূপদীপেও তো চলতে পারত। কিন্তু চলল না। শৌভিককাকু অঙ্ক ক্লাসে ঘোষণা করল, যে তার এক কলিগের মেয়েও নাকি পরদিন থেকে তাদের সঙ্গে পড়তে আসবে। নাক না সিঁটকোলেও দীপের ঠোঁটটা একটু বেঁকে যায়। কাকুর চোখে সেটা ধরা পড়তেই জানতে চায়, মেয়েতে ওর অ্যালার্জি আছে কিনা? রূপদীপ জানায়, “ধুর, অ্যালার্জি হবে কেন? এত প্যানপ্যান করে মেয়েগুলো। ঠিক পোষায় না।”
“বটে? তবে দেবারতিদির মেয়েটি অমন আমজনতা নয়। আসলে পরেই টের পাবি। ওর পাল্লায় পড়লে প্যানপ্যানটা না তোদের করতে হয়।”
এই অবধি বলেই কাকু ক্ষান্ত দিয়েছিল। ওদের খুঁতখুঁতুনি তবু যায়নি। কিন্তু দেখা গেল, কাকু কিছু ভুল বলেনি। প্রথমদিন ক্লাসে ঢুকেই শ্রীজিতের পাশে ধপ করে নিজের পিঠব্যাগ ফেলে দিয়েই মেয়েটা জানাল সে মৌলীনা। এবং সাথে সাথেই জানতে চাইল তাদের পরিচয়। ওর বাড়ানো হাতে হাত মিলিয়ে দীপ জিজ্ঞাসা করেছে, “দেবারতিদির মেয়ে?”
“এই, দেবারতিদি কি? শৌভিকমামাও আমার মায়ের সামনে কেঁচো, তা জানিস? কাকিমা বা মাসিমা বলবি। বুঝলি?”
প্রথম দিনেই নিজের দাপট দেখানো, এই মেয়ের সঙ্গে কিন্তু ভালই জমে যায় রূপদীপ, শ্রীজিতের। নিজেদের মত আড্ডাবাজ, মুখফোঁড়, ডোণ্ট কেয়ার কাউকে পেলে সে ছেলে না মেয়ে কে আর তোয়াক্কা করে? তমালের অভাব পুষিয়ে যায়। কয়েকদিন পরে যখন প্রজ্ঞা নামের আরেকটা মেয়ে ওদের সঙ্গে যোগ দিল, তাকে নিয়ে ওরা আর বিশেষ ভাবনাচিন্তা করেনি। জানে, মৌলীনা ঠিক তাকে সামলে নেবে। ওদের মনগুলো, শৌভিককাকুর পড়ানোর গুণে ইচ্ছুকভাবেই এগোচ্ছিল, অনিচ্ছার পাহাড় ভেঙে ভেঙে। হোমওয়ার্ক না পেলেই কাকু শাসাত, বিশেষ করে মৌলীনা আর রূপদীপকে। একজনের মা আর একজনের বাবাকে নালিশ করবে বলে। ওরাও তেমনি হাড় বজ্জাত। মৌলীনা জানায় যে, ডিপার্টমেণ্টের হেড মায়ের অত সময় নেই তাকে দেখার। আর দীপ বলে, বাবা ওর কচু করবে। কাকুকেই তখন লাগতে হয় এইসব নির্ভীক দস্যুদের জব্দ করতে। কিন্তু হোমওয়ার্কের বোঝা বাড়ালেও ভয় পাবার পাত্র তারা মোটেও নয়। এইভাবে ভাল-মন্দে দিন কাটে।
সেটা ছিল অঙ্কের দিন। আগেভাগে পড়তে চলে এসেছিল দীপ। কতকগুলো অঙ্ক কিছুতেই মিলছিল না। খাতা খুলে বসে সে’গুলো নিয়েই লড়ছিল। মৌলীনা স্বভাবমত ঘরে ঢুকেই ধপাস করে পিঠ থেকে ব্যাগ ফেলে জানতে চেয়েছে, “কি রে? জিত আসবে না?”
বিজাতীয় নাম শুনেই হোঁচট খায় রূপদীপ। স্কুলে শ্রীজিতকে অনেক রকম নামে তারা ডাকে। কিন্তু, তা বলে জিত? একটা খটকা ঢুকে যায় মনে। কী চলছে তাহলে তলে তলে? সামলে নিয়ে জানতে চাইবে, যে না আসার কথা কি কিছু ছিল, তার আগেই শ্রীজিতের জুতোর শব্দ পাওয়া যায় বাইরে। মৌলীনা কি একটু উচ্ছসিত হয়ে পড়ে? ঠিক বোঝা যায় না। মেয়ে যে বেশ সেয়ানা, সে তো ভালই জানা। বাড়ি ফেরার পথে, রূপদীপ জানতে চায় শ্রীজিতের কাছে, “শালিকছানা জিত হ’ল কীভাবে?”
শ্রীজিতের বাবার নাম শিবালিক মজুমদার। বন্ধুদের মুখে মুখে তিনি শালিক এবং তাঁর ছেলে বলাই বাহুল্য শালিকছানা। অবাক হয়ে শ্রীজিত জানতে চায়, “কোন জেতার কথা বলছিস?”
“মেয়েদের মত ন্যাকা বনে যাস না। জেতার কথা বলিনি, জিত বলেছি। আমরা তো শ্রীজিতই জানি কিংবা ছোটু। স্পেশাল কারুর জন্য কি জিত? কী কারবার চলছে চাঁদু?”
এতক্ষণে শ্রীজিতের বোধগম্যে আসে দীপ কী বলতে চাইছে। হ্যাঁ, মৌলীনা তাকে আগের দিনই জানিয়েছে যে, সে তাকে জিত বলে ডাকবে, অত শ্রী-টি দিতে পারবে না। দীপ সেদিন আসেনি, তাই বিষয়টা জানে না। সেইটা নিয়েই এখন হুমকি দিচ্ছে ও। ব্যাপারটা মোটেই ভাল লাগে না শ্রীজিতের। একে তো মৌলীনার কটকটে মন্তব্য, তার ওপরে শুধুমুধু দীপের এই ফালতু খিল্লি, কার সহ্য হয়?
“ভাল হচ্ছে না কিন্তু দীপ।”
“হচ্ছে না মানে, আলবাত হচ্ছে। এবার একেবারে বিন্দাস হবে।”
শ্রীজিত বুঝে যায় স্কুলে তার অবস্থা খারাপ হতে চলেছে। ওদিকে অঘটনও ঘটে যায় কখনও কখনও, যাতে করে রূপদীপের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। আসবে না জানিয়েও গুটিগুটি পায়ে ঠিক ক্লাসে চলে আসে শ্রীজিত। আর সেদিনই ঠিক শৌভিককাকু ক্লাসে এসে জানায়, মৌলীনাকে বাদ দিয়েই ক্লাস হবে। তার মা জানিয়েছেন, সে ঘুম থেকেই ওঠেনি। কিন্তু দেখা যায় ক্লাস শুরু হবার, মিনিট ১৫ বাদে তিনিও হাঁপাতে হাঁপাতে হাজির, শৌভিককাকুকে অবাক করে। মৌলীনার কৈফিয়ত, আবার শৌভিকমামা তাকে আলাদা করে বোঝাবে, তাই সে তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছে। কাকু আশ্বস্ত হলেও, শ্রীজিতের খাতার ওপরে সকলের নজর এড়িয়ে চিরকুট পৌঁছোয়,
“প্রোগ্রাম ক্যানসেল, বুঝি?”
এইসব দুষ্টু খবরেরা স্কুলের বাতাসেও কম ঘোরাফেরা করে না রূপদীপের কল্যাণে। অফ-ক্লাসে তাকে ঘিরে গোলটেবিল। বিতান, তমাল, অভিষেক, অভিজ্ঞান, তৃণাঞ্জন এবং অনীকের। “জিনা হারাম” হয়ে পড়ে শ্রীজিতের। রূপদীপকে শাসায় সে, “তোর বুঝি আর দিন আসবে না?”
“আসুক তো আগে। কিন্তু জিত কি আজকের ফিজিক্স ক্লাসটা অফ করবে? তাহলে কিন্তু দিব্যি ইন্দিরা ময়দানের বইমেলাতে ঘোরা যাবে।”
শ্রীজিত তাড়া করে রূপদীপকে। হৈ-হৈ পরে যায় ক্লাসে। “আমরা জিতব বাজি নিশ্চয়” – অনীকের বেসুরো প্যারোডি তাকে আরো খেপিয়ে দেয়। অন্যদের নিয়ে মজা করতে অনীকের উৎসাহ চিরদিনই বেশি। হঠাৎই সে রূপদীপকে জানায় শৌভিককাকুর কাছে সেও অঙ্ক করবে ভাবছে। যদিও অঙ্ক তার ফোর্থ সাবজেক্ট। কিন্তু তাকে তো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য জয়েণ্ট পরীক্ষায় বসতে হবে। রূপদীপ ওর উৎসাহের কারণ ভালই বুঝেছে। তবু শৌভিককাকুকে বলে অনীককে ওদের সঙ্গে জুটিয়ে নেয়। প্রথম দিন ক্লাসে যাওয়ার আগেই নাচতে থাকে অনীক। আজকে ছোটু ওরফে শ্রীজিতের দফারফা করে দেবে সে। এমন ছড়া লিখবে যে…। ওর এই বাড়াবাড়ি রকমের লাফালাফিতে রূপদীপ অবধি বিরক্ত হয়ে যায়। আরে, এটা তো আর স্কুল নয়। মৌলীনা, প্রজ্ঞা, শৌভিককাকু আছে। এখানে স্কুলের চ্যাংড়ামি চলবে না। তারপর মৌলীনা যা মেয়ে, বুঝতে পারলে তুলে আছাড় মেরে দিতে পারে। কিন্তু এসব কিছুই ঘটে না। চিরাচরিতভাবেই শৌভিককাকু অঙ্ক বুঝিয়ে, হোমওয়ার্ক দিয়ে পড়ানো শেষ করে।
ক্লাস শেষ হতে তিন বন্ধু রাস্তায় হাঁটছে। অনীক একেবারে স্পিকটি নট্। কেমন যেন সন্দেহ হয় ওদের। রূপদীপ শ্রীজিতকে বলে, “ছোটু, চলন্ত মমি দেখেছিস?”
“মনে হচ্ছে ঠিক মতো দানাপানি পায়নি।”
“দানাপানির কেস এটা নয়। অন্য কিছুর গন্ধ পাচ্ছি। পেটে একটা খোঁচা দে তো”।
এবার আর উচ্ছাস চাপতে পারে না অনীক, “মৌলীনাকে কি দারুণ দেখতে। আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে ওকে।”
চোখ গোল-গোল হয় শ্রীজিতের। রূপদীপ ভুরু কুঁচকোয়। “বলো হরি, আবার তুই? এই তো সেদিন কেস খেলি কিরণের বোনের কাছে। লজ্জা-শরম কিছু নেই নাকি রে?”
নিজের বিপদমুক্তির সম্ভবনা দেখে শ্রীজিতই কথাগুলো বলে। আর রূপদীপের মনে তখন অন্য জিঘাংসা। কিন্তু অনীককে ঠেকায় কে? সে এসবের থোড়াই পরোয়া করে? রোজ রোজ মৌলীনার গুণকীর্তন শুনতে শুনতে অভিজ্ঞান বলে, “ছোটুকে নিয়ে এত কিসসা কাহিনী করে শেষে কিনা এই ফলাফল? অনীক?”
“জানিসই তো স্বভাব। মেয়ে দেখলেই ওনার ঘাড় মটকে যায়।”
অতএব দীপের পরিকল্পনা অনীককে বার খাইয়ে ইন্ধন জোগানো। অন্যরাও দিব্যি তালে তাল মেলাচ্ছিল। কিন্তু ডুবিয়ে দিলো তৃণাঞ্জন। অনীককে সে ধমকায়, “এতো নাচছিস কেন জাম্বুবান? মৌলীনার বয়ফ্রেণ্ড আছে। বিশ্বাস না হলে চন্দ্রিলকে জিজ্ঞেস কর। ওর গার্লফ্রেণ্ড তীর্ণা আর মৌলীনা ভাল বন্ধু। দু’জনে এক স্কুলে পড়ে।”
তৃণাঞ্জনটা গাধা একেবারে। এত চোখ মটকে ইসারা করেও থামানো গেল না ওকে। সৌভাগ্যবশতঃ চন্দ্রিলকে ধারপাশে পাওয়া যায় না। মুখ বেজার করে অনীক বাড়ির দিকে রওনা দেয়। অন্য মাথাগুলো ঝুঁকে আসে রূপদীপের দিকে। কারণ সে-ই তো প্ল্যান করেছে অনীককে কেস খাওয়ানোর।
“এবার তাহলে কী করবি? তৃণাঞ্জন তো কেলিয়ে দিল সব কথা।”
“চন্দ্রিলকে দিয়ে বলিয়ে নেব, যে মৌলীনার বয়ফ্রেণ্ড ছিল বটে, কিন্তু সেটা এখন ইতিহাস হয়ে গেছে। এটা শুনলেই ঐ হতচ্ছাড়া নির্ঘাৎ ফাঁসবে।”
বন্ধুরা জানতে চায়, তাতে দীপের কোন সুবিধেটা হবে? রূপদীপ বলে, যে এটা ওর নিদারুণ প্রতিশোধ। কিরণের বোন ওকে ল্যাং মারল। আর ও কিনা দীপকে নিয়ে ছড়া বেঁধে, সকলের কাছে মেসেজ পাঠিয়ে দিল। কত হেল্প করেছে সে অনীককে, কিভাবে বাঁচিয়েছে। এমন অকৃতজ্ঞ, বিশ্বাসঘাতককে কিছুতেই ছাড়বে না এবার রূপদীপ।
২
ষড়যন্ত্র চলে রূপদীপের পরিকল্পনা অনুযায়ী। অত্যুৎসাহী অনীকের লাফঝাঁপও বেড়েছে। শৌভিককাকুর ক্লাস নেওয়ার বা পরীক্ষার সময় বদলালে, সেই দিন মৌলীনা যদি না এসে থাকে, সঙ্গে সঙ্গে অনীক তাকাবে রূপদীপের দিকে, “দীপ, মৌলীনাকে তো জানানো দরকার যে, শুক্রবারের ফিজিক্স ক্লাসটা কাকু রোববার সকালে নেবে।”
রূপদীপ যদি বলে তাদের কিসের দায়, মৌলীনাকে জানানোর? শৌভিককাকুই জানিয়ে দেবে ঠিক। অনীকের ঘ্যানঘ্যানানি অমনি শুরু, “কাকু যদি ভুলে যায়? বেচারার শুধু শুধু পড়া মিস হবে।”
“তার চেয়ে বল না, মৌলীনাকে না দেখলে ঘুম হবে না তোর।”
এসব মন্তব্যে বিচলিত হয় না অনীক। ক্রমাগতঃ অনুরোধ-উপরোধ চালিয়ে যায়, রূপদীপ যেন ওদের বাড়ির ল্যাণ্ডফোন থেকে কল করে মৌলীনাকে জানিয়ে দেয়। অনীকের বাড়িতে ল্যাণ্ডফোন নেই। আর মায়ের মোবাইলে সব সময় অধিকার জমানোর চাপ আছে। রূপদীপ জানায় তার কাছে মৌলীনাদের বাড়ির ফোনের নম্বর নেই। তখন অনেক জলঘোলা করে চন্দ্রিলকে ধরে, ওর গার্লফ্রেণ্ড তীর্ণার থেকে সেই নম্বর জোগাড় করা হয়। এসব বন্দোবস্ত অনীকই করে। তার জন্য সময় কিছুটা কেটে যায়। অনীকের উদ্বেগও বাড়তে থাকে। কিন্তু রূপদীপ যখন ফোনে খবরটা পৌঁছে দেয়, মৌলীনা খুশিই হয়। শৌভিককাকু সত্যিই ওকে জানাতে ভুলে গেছে। এরপর ও জানতে চায়, “নম্বর পেলি কোথা থেকে?”
“জোগাড় করতে হ’ল।”
মৌলীনা ওকে থ্যাঙ্কস জানিয়ে ওর বাড়ির নম্বরটাও চেয়ে নেয়। রূপদীপ বলে, “আমারও মনে ছিল না তোকে জানানোর কথা। অনীকই তো মনে করিয়ে দিল, তোর নম্বরও ওই জোগাড় করে এনেছে।”
“উফ্ গ্রেট। অনীককে বলিস, ওকে চকলেট খাইয়ে দেব।”
কিন্তু বন্ধুদের সামনে যতই বোলচাল দিক না কেন, মৌলীনাকে দেখলেই অনীক স্রেফ মৌনীবাবা বনে যায়। সেদিন রূপদীপের কথায় ভুলে, ও মৌলীনাকে মুগ্ধ করার জন্য, নিজের মাউথ-অর্গানটাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে শৌভিককাকুর ক্লাসে। সেটা এ হাত, ও হাত ঘোরাফেরা করতে করতেই মৌলীনা হাজির। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন রূপদীপকে, “কার রে এটা, তোর?”
মাথা নেড়ে রূপদীপ অনীককে দেখিয়ে দেয়। মৌলীনা ভুরু কুঁচকে তাকায় অনীকের দিকে, “বাজাতে পারিস নিশ্চয়ই। তাহলে বসে আছিস কেন? বাজা।”
“কা-কাকু যদি এসে পড়ে?”
“তুই এত নার্ভাস হচ্ছিস কেন? আসবে না। আমি দেখে এসেছি, নিতাইয়ের দোকানে সবে চায়ের অর্ডার দিয়েছে। এরপর চা খাবে। সিগারেট ধরাবে। ততক্ষণে তোর বাজানো হয়ে যাবে। নে, শুরু কর।”
মাউথ-অর্গান অবশ্য অনীক ভালই বাজাতে পারে, তাতে ওকে বিশেষ বেগ পেতে হয় না। কিন্তু এরপরেই রূপদীপ প্রস্তুত ছিল তার জন্য। রাস্তায় নেমেই চালু হয়ে যায়, “তা’লে খোকা, বাজনা তো বেশ হ’ল, দিব্যি হ’ল। প্রোপোজ করছিস কবে?”
“করব, করব, ঠিক করব। দেখে নিস।”
এদিকে এতোল বেতোল দিনেরা যত এগোতে থাকে, দীপের তাড়াও বাড়ে, “কি হে, কদ্দূর?”
অনীক ভান করে যেন কিছুই বুঝছে না। সেইভাবেই সটকে পড়ে। কিন্তু অসতর্ক মুহূর্তরা কখন তাকে এনে ফেলে বন্ধুদের চক্রব্যূহে, সে জানতেও পারে না। মোবাইল ফোন রাখা বন্ধুরা তখন টানাপোড়েন এনে দেয় ওর মধ্যে। ক্ষেপে গিয়ে সে যদি কখনও রূপদীপের ঢোলা প্যাণ্ট টেনে, ইঞ্চিখানেক নিচে নামিয়ে দেয়, সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ যায় দীপের, “ছোটু, মৌলীনার নম্বরে চেষ্টা কর তো।”
ফুর্তিবাজ অনীক সাঁ করে ঘুরে দাঁড়াবার আগেই শুনতে পায়, শ্রীজিত বলছে, “মৌলীনা? দাঁড়া, ধর একটু। দীপ কথা বলবে।”
আর তখনই রূপদীপের কান, কান পাতে শ্রীজিতের ছোট্ট চলমান যন্ত্রের স্ক্রিনে, আর মুখ বলে চলে, “মৌলীনা? – রোববার সকালে পাথফাইণ্ডারের মকটেস্টটা দিবি তো? নাকি এবারেও বাঙ্ক? – আসছিস? – ভেরি গুড – আচ্ছা তা’লে শোন, তোর সঙ্গে কথা আছে – সেদিন ফেরার সময় বলব – না,না, এখন কিছু বলতে পারছি না। একটু কনফিডেন্সিয়াল ব্যাপার।”
শ্রীজিতকে ফোন ফেরত দেবার অপেক্ষা মাত্র, ঝাঁপিয়ে পড়ে অনীক ওর ওপরে, “কী? কী বলবি তুই ওকে?”
“সেটা তোকে বলব কেন? আর আমার প্যাণ্টে হাত দিবি তুই?”
“এটা কিন্তু আনফেয়ার হচ্ছে দীপ।”
“কিসের আনফেয়ার? আমার ওর সঙ্গে কনফিডেন্সিয়াল কথা থাকতে পারে না? আচ্ছা শোন, আমি ঠিক করেছি ওকে প্রোপোজ করব। ঠিক আছে?”
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় অনীক। বোকার মত জানতে চায় কার জন্য প্রোপোজাল দেবে দীপ? জবাব আসে, “কেন? নিজের জন্য। তুই কি ভেবেছিস বার বার তোর কথা বলতে যাব?”
“তু-তু-তুই কেন…?”
“প্রোপোজ করব? এটাই জানতে চাইছিস তো? কারণ আমারও মৌলীনাকে ভাল লাগে। কথা তো আমিই বলি ওর সঙ্গে। আমার সাহস আছে। আর আমাকে ও বোধহয় পছন্দও করে।”
পিছু হঠতে চায় না অনীক। জেদ করে বলে, “আমারও সাহস আছে।”
সেটাই তো চাইছিল রূপদীপ। সে জানায়, “বেশ, তাহলে তুই-ই প্রোপোজ কর আগে। তোকে চান্স ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু তার আগে প্রতিজ্ঞা কর, আর আমার প্যাণ্টে হাত-টাত দিবি না। তাহলে কিন্তু কেস জণ্ডিস করে দেব।”
গোঁ-গোঁ করেও অনীককে রাজি হতে হয়। বন্ধুদের হাতে চান্স সে নিজেই তুলে দিয়েছে। এখন আর উপায় কী?
কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদেরও থমকাতে হ’ল একসময়। বায়োলজি প্র্যাক্টিকালের শেষে অনীক নেই দেখে চন্দ্রিল ওদের জানাল, “খোকাকে তো তোল্লাই দিয়ে আকাশে তুলছিস তোরা। ওদিকে তীর্ণা কাল বলছিল, কয়েকদিন আগেই কেমিস্ট্রি কোচিং-এর একটা ছেলেকে মৌলীনা তুলোধোনা করে ছেড়েছে। সে শুধু হাসি-হাসি মুখে মৌলীনাকে বলেছিল, ‘তোকে আমার খুউব ভাল লাগে।’ সঙ্গে সঙ্গে মৌলীনা উত্তর দিয়েছে, ‘তোকেও না, আমার খুউব ভাল লাগে। কেমন বল তো? আমাদের ফ্ল্যাটের পেছনদিকে না একটা মস্ত বড় অশ্বত্থ গাছ আছে। তার ডালে একটা হুতোমপেঁচা বাসা বেঁধেছে। মাঝে মাঝে সেটা আবার হুতুম-থুম করে বিকট আওয়াজ তোলে। তোকে না ঠিক ওই পেঁচাটার মত লাগে আমার। ওটারও তোর মতই ড্যাবা-ড্যাবা চোখ, থ্যাবড়া থ্যাবড়া নাক-মুখ।’ কোচিং-এর সব ছেলেমেয়ের সামনে এমন করে বলেছে, যে সে বেচারা পালানোর পথ পায়নি। কোচিং ছেড়েই দিতে হ’ল তাকে।”
ঘটনা শুনে কপালে ভাঁজ পড়ে রূপদীপের। এবার তার বাড়ির ল্যাণ্ডফোন থেকে একটা স্বতঃস্ফূর্ত কল করে সে মৌলীনাকে। জানায় যে, সে একটা জরুরী বিষয়ে কথা বলতে চায়। এবং বাড়ি থেকে দূরে নিক্কোপার্কে তাদের সাক্ষাতের জায়গা নির্দ্দিষ্ট করে নেয়। যেহেতু দুজনেরই বাবা-মা চাকরি করে, তাই দুজনেই একটু বেশি অবাধ সময় অন্যান্যদের তুলনায়। সমস্ত ঘটনা শুনে মৌলীনা একটু অবাকই হয়, “অনীক? আমি তো ভেবেছিলাম, তুই নিজের কথা বলবি বলে ডেকেছিস।”
“কিরণের বোনও তাই ভেবেছিল।”
“কিরণের বোন? সেটা আবার কি ঘটনা?”
রূপদীপকে তখন ৭-৮ মাস আগে ঘটে যাওয়া কাহিনী খুলে বলতে হয়। সব শুনে গালে হাত রেখে মৌলীনা বলে,”আসলে দোষটা তো ওর নয়। বয়সের দোষ।”
“চুপ কর। তুই আর দিদিমাদের মত কথা বলিস না তো। ওর সব ভাল। কিন্তু একটু বেশি পরিমাণে ইমম্যাচিওর।”
“আর তুই বুঝি খুব ম্যাচিওর?” হেসে জানতে চায় মৌলীনা।
রূপদীপের জবাব, “অন্ততঃ ওর থেকে বেশি। নাহলে ডাকতাম না তোকে। যাহোক, তুই “হ্যাঁ” বা “না” যাই বলিস, ওকে প্লিজ হার্ট করে কথা বলিস না। তোর যা রেকর্ড শুনলাম…”
মৌলীনার সঙ্গে এই আলাপ অনেকটাই নিশ্চিন্ত করে রূপদীপকে। আর সেটাকে নিশ্চিন্ততর করে দেয় মৌলীনা স্বয়ং। কয়েকদিন পরে শ্রীজিত ছুটতে ছুটতে স্কুলে ঢুকে সবার মধ্যমণি হয়ে বসে পড়ে।
“কাল সন্ধ্যেবেলা, আটটা নাগাদ, মৌলীনার সঙ্গে দেখা হ’ল। জানিস, ওর বয়ফ্রেণ্ডের সঙ্গে ঘুরছিল? আমাকে ডেকে তার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল।”
“আমি আগেই বলেছিলাম, তোরাই তো শুনলি না। খোকাকে খালি উস্কোতে থাকলি।” তৃণাঞ্জন নাক ফোলায়। রূপদীপ আড়ে তাকায় একবার অনীকের দিকে। হতভম্ব অনীক খানিক চুপ থেকে, উদাস হয়ে যায়।
“তাহলে আর প্রোপোজ করে কি হবে?”
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রূপদীপ। মনে মনে বলে, “যাক বাবা। বাঁচা গেল। আবার একটা কুরুক্ষেত্র ঘটতে যাচ্ছিল।”
কথাটা যতই মনে মনে বলুক, অনীকের হাত থেকে কিন্তু ওর সহজে রেহাই মেলে না। দুপুরবেলায় ক্যালকুলাসের টানাপোড়েনে যখন জেরবার হয়ে পড়েছে, অনীক এসে ধরে মৌলীনাকে ফোন করতে হবে বলে। বিরক্ত হয় দীপ, আবার কি হ’ল ফোন করার মত? অনীক জানায় মৌলীনাদের ফ্ল্যাটের পাশের মাঠের ফাংশানে নাকি লোপামুদ্রার আসার কথা। খবরটা সত্যি কিনা সেটা জেনে দিতে হবে। রূপদীপ এড়াতে চায় অনীককে।
“বিরক্ত করিস না খোকা। একে অঙ্ক মিলছে না আমার, তায় তোর এই ফালতু আবদার। কেটে পড় তো এখন।”
কিন্তু অনীক নাছোড়বান্দা। বন্ধু হয়ে এতটুকু করবে না দীপ – ইত্যাদি, ইত্যাদিতে মাথাখারাপ করে তোলে। অসহ্য হয়েই ডায়াল ঘোরাতে হয় রূপদীপকে। লোপামুদ্রা সত্যিই ফাংশানে আসছে জানিয়ে, মৌলীনা জিগ্যেস করে, “কে আসবে ফাংশান দেখতে? তুই না কাকিমা?”
“আমরা কেউ না। অনীক।”
অনীক গান শুনতে যায় নাকি যায় না, সেই খবর রূপদীপ জানতে পারেনি। কিন্তু সে লক্ষ্য করে শৌভিককাকুর ক্লাসে মৌলীনা একেবারে স্পিকটি নট হয়ে আছে। ব্যাপার কিছুটা আন্দাজ করে আবারও দুপুরে ফোনের ডায়াল ঘোরায় ও।
“কী ব্যাপার রে তোর? কথা বলছিস না কেন?”
“এত কথা জানানোর পরেও তুই আবার অনীককে প্রশ্রয় দিচ্ছিস কিভাবে?” ভনিতা না করে মৌলীনা সরাসরি কামান দাগে।
রূপদীপ বলে,”প্রশ্রয়? ঐ হনুমানকে? কি ব্যাপার বল তো? ওহোঃ, ঐ লোপামুদ্রার গানের কেস? আরে, সেদিন ও এমন মাথা চিবোচ্ছিলো আমার ‘ফোন কর’ ‘ফোন কর’ বলে, একে ক্যালকুলাস মিলছিল না সেদিন, তার ওপরে এই হুজ্জুতি। বাধ্য হয়েই তোকে…”
“তাহলে ঠিক আছে। তোর দোষ নেই, মেনে নিলাম।”
রূপদীপ এবার উপযাজক হয়েই শ্রীজিতের কথাটা পাড়ে মৌলীনার কাছে। জানায় অনীক ব্যাপারটা জেনে খুব দমে গেছে। আর বোধহয় ওর সাহস হবে না মৌলীনার দিকে এগোনোর। মৌলীনা খুশি-খুশি গলায় বলে ওঠে, “তাই নাকি? ভেরি গুড। তাহলে তো আমার মিশন সাকসেসফুল।”
৩
ভাবীকালের ঘরে কিন্তু লেখা ছিল অন্য কিছু।
রবিবারের বিকেল। পাথ-ফাইণ্ডার থেকে মকটেস্ট দিয়ে বাড়ি ফিরবে রূপদীপ। মৌলীনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। রাম ফাঁকিবাজ মেয়েটা আজ বহুদিন পরে অঙ্ক পরীক্ষা দিতে এসেছে। বাড়িতে ধ্যাঁতানি খেয়েছে বোধহয়। তৃণাঞ্জন আর স্বস্তিকও আসে অন্যান্য দিন। অঙ্ক বলেই আসেনি। ওরা মেডিক্যালের জয়েণ্ট দেবে। সুতরাং আজ তারা দু’জনই কেবল এসেছে। মৌলীনা প্রস্তাব দেয়, “চল, আজ হেঁটে ফিরি।”
হাঁটতে হাঁটতেই জানা হয়ে যায় আরেকটা সত্যিও। মৌলীনা জানায়, শ্রীজিতকে যার সঙ্গে ও আলাপ করিয়ে দিয়েছিল, সে কিন্তু ওর বয়ফ্রেণ্ড নয়, কেমিস্ট্রি ক্লাসের বন্ধু। আসলে শ্রীজিতকে দূর থেকে দেখতে পেয়েই ওর মাথায় বুদ্ধি খেলেছিল। ইচ্ছে করেই ওকে ডেকে বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করিয়েছিল। তার জন্য বন্ধুকে রীতিমত ট্রিট দিতে হয়েছে ওকে।
“অনীকের জন্যেই এই ড্রামাটা করতে হ’ল। তুই বলেছিলি, ওকে হার্ট না করতে। কিন্তু আমার মেজাজ তো, কখন কি বলে দেব। তাই সুযোগ যখন এল, সেরেই ফেললাম ব্যাপারটাকে। আসলে কি জানিস তো, আগে আমার একজন বয়ফ্রেণ্ড সত্যিই ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে টেকা গেল না, এত কনজারভেটিভ। এখনও ফোনে কথা-টথা হয়। মাঝেমধ্যে একসঙ্গে খেতে-টেতেও যাই। কিন্তু ওই অবধিই। আর কোন সম্পর্ক নেই।”
মুখ না খুলেও রূপদীপ হাঁ করে মৌলীনার কথাগুলো গিলছিল। ভিতরে ভিতরে কী যেন কি চলছিল তার। সামনেই দমদম মেলার গেট। হঠাৎই সে বলে বসে,
“মেলায় যাবি? চ, ঘুরে আসি।”
“মেলায় গিয়ে কি করবি?” মৌলীনা যেন একটু সন্ধিগ্ধ হয়ে পড়ে।
দীপ জানায়, “নাগরদোলা চড়ব। চড়েছিস কখনও?”
“উঁহুঁ!”
“কান্নাকাটি যদি না করিস, তাহলে চড়তে পারিস।”
“বাজে বকিস না। কান্নাকাটি করব কেন? আচ্ছা চল, দেখা যাক, কেমন তোর নাগরদোলা।”
নাগরদোলায় চড়ে মৌলীনা কান্নাকাটি না করলেও, চিৎকার করতে কিন্তু ছাড়ে না। খামচে ধরে থাকে রূপদীপের হাত। আর ঘূর্ণিপাক ছেড়ে বেরিয়ে এসে তিন থাপ্পড় লাগায় রূপদীপকে, “কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই তোর। এমন বাজে বোঁ-বোঁ করে ঘোরা বিচ্ছিরি জিনিসে চড়ে, কি মজা পাস…?” চড়ের সঙ্গে ইত্যাদির উষ্মারাও চড়াও হয়ে চলতেই থাকে। খানিক সামলালে দীপ বলে, “মাথা ঠাণ্ডা কর। চল, ফুচকা খাই।”
ফুচকার কথায় কোন মেয়ের মাথা না ঠাণ্ডা হয়? ফুচকা খেয়ে, গ্রিটিংস কার্ড – আরও কিসব হাবিজাবি কিনে দু’জনে যে যার বাড়ির দিকে রওনা দেয়। এই ঘটনা তো গিলে ফেলাই যেত। কিন্তু পা যাদের আঠারোর দিকে, সব সময়ে বন্ধুদের কাছ থেকে নিজেকে তারা লুকোতে পারে না। অতএব কাছাকাছি বাড়িতে থাকা অনীকের আদ্যোপান্ত ঘটনা জানা হয়ে যায়।
“আবারও তুই, দীপ? দেখ, বেছে বেছে তোকেই বলেছে যে ওর এখন কোন বয়ফ্রেণ্ড নেই।”
“হ্যাঁ, তো কী আছে তাতে? ভাল বন্ধু মনে করেই বলেছে। তোর সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি।”
“আচ্ছা? তাহলে মেলায় যাওয়া, নাগরদোলা চড়া, ফুচকা খাওয়া, সবই ফক্কা?”
“ফক্কা কি ছক্কা, তুই-ই জানিস। যা পারিস তাই ইমাজিন করে নিস।”
“ওহ্, আর তুই কিছুই জানিস না, না? ক’দিন আগেই কোন এক মেয়ের সঙ্গে ইনভলভ হওয়ার গল্প বলে কাকিমার লেগপুলিং করেছিলি না? তখন কাকিমা তো মৌলীনার কথাই ভেবেছিল, তাই না?”
“ও তো মা মৌলীনা ছাড়া আর কারও নাম জানে না, তাই ধরে নিয়েছিল ওটা ও-ই হবে।”
“কেন? কাকিমা তো প্রজ্ঞার কথাও জানে।”
“হ্যাঁ, কিন্তু মা এটাও জানে যে, প্রজ্ঞাকে আমি মোটেও পছন্দ করি না।”
“মৌলীনাকে করিস, তাই তো? সেই ভেবেই কাকিমা বলেছে। দেখ প্রথমে তোর টার্গেট ছিলো ছোটু। তারপর আমি। কিন্তু এখন তুই কি বলবি দীপ? নাগরদোলায় চড়ানোর পরেও…”
“উফ্, বহুত ঝাড় হ’ল তো তোকে সব কিছু বলে। থামতেই চাইছিস না মোটে। আমার মনে তেমন কিছু থাকলে থোড়িই বলতাম তোকে?”
“সে তুই এখন সাধু সাজতে চাইছিস বলে, বলে দিলি সব। পাছে তোদের অন্য কেউ দেখে ফেলে থাকে। তাই নিজেই উগড়ে দিলি। কিন্তু ঝাড়ের কি দেখেছিস এখনও? দাঁড়া না, হচ্ছে তোর।”
স্বাভাবিকভাবেই অনীকের মনে তখন বদলার আগুন জ্বলছে। টেস্ট পরীক্ষা শেষ। স্কুল বন্ধ। তা সত্ত্বেও মায়ের মোবাইল ঝেড়ে ফোনে ফোনে বার্তা পাঠায় অনীক, “হ্যারি পটারের পরবর্তী রোমাঞ্চকর অভিযান”। আর বন্ধুরাও যখন তখন বাড়ির ল্যাণ্ডফোনে অস্থির করে রূপদীপকে, কী খবর? কোথায় ঘটল? ইত্যাদি, প্রভৃতির ভিড় করা একাধিক প্রশ্নরা ওকে জেরবার করে দেয়। টেস্টের রেজাল্টের দিন তো আরেক প্রস্থ ছড়া কাটা শুরু করেছিল অনীক। অবশ্য রেজাল্ট দেখে, পাস করার খবর পাবার পরেই এই গুলতানি শুরু হয়েছিল। পালানোর উপায় তো নেই। চুপচাপ শুনতে শুনতে একসময়ে ক্ষেপে গিয়ে রূপদীপ ধমকায় অনীককে,
“এইসব আজেবাজে ইমাজিনেশান তোর মাথায় সারাক্ষণ গিজগিজ করে। আবার কোথায় ফাঁসবি এই করে করে। তখন আবারও তো আমাকেই উদ্ধার করতে হবে তোকে।”
কিন্তু বন্ধুরা এখন সকলে ঘুরে গেছে অনীকের পক্ষে। কিছুদিন আগে রূপদীপ তো অনেক হেনস্থা করেছে অনীককে। সুতরাং তারাই বা ছাড়বে কেন? একমাত্র কিরণই ওর সহায় হয়। অনীককে বলে, “তোর লজ্জা করে না এসব করতে? যাকে পছন্দ করিস, সে-ই তো চলে যায় দীপের দিকে? সবাই তো আর ওর মত হ্যারি পটারের লুক পেতে পারে না?”
অনীকও গলা উঁচোয়, “তুই থাম্। তোর তো পুরো ঝুল কেস। সব জানি রে, সব জানি। দেব একদিন ফাঁস করে।”
রূপদীপই এবার দুজনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায়, “থামবি তোরা? এইচ-এসটা কি দিতে হবে না? নাকি দীপ্রদার মত দাঁত বের করে বললেই চলবে, ‘কল করেছিলাম, মিস্কল হয়ে গেছে, দুজনেরই-‘। ওসব ইমোশান এখন ক’দিনের জন্যে ব্যাগে ভরে তাকে তুলে রাখ। যা করার, মে-জুন পেরিয়ে করিস। ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ঢোকার পরে, বুঝলি?”
বন্ধুরা এ-ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। চিরদিনের পড়া ফাঁকি দেওয়ার ওস্তাদ রূপদীপ বলছে কথাগুলো? ওরা জানতে চায়, “তুইও তাই করবি দীপ?”
“না তো কি বাবা-মায়ের ঝাড় খাব? রেজাল্ট খারাপ হ’লে কেউ কি ছেড়ে কথা বলবে? আর তাছাড়া কোন মেয়েও কি ফিরে তাকাবে তখন? এমনিতেই মেয়েগুলো প্রচণ্ড কেরিয়ারিস্ট। সুতরাং, নো রিস্ক।”
ফের একটা সুযোগ পেয়ে যায় অনীক, “মৌলীনাকে কেরিয়ারিস্ট বললি তুই? দাঁড়া জানাচ্ছি।”
“জানা। ফোন নম্বরটা আমার থেকেই নিবি তো? তার আগে অঙ্কের খাতাটা ফেরত দিস। শৌভিককাকুর হোমওয়ার্ক পুরোপুরি শেষ করা হয়নি এখনও।”
এইবার ফেঁসে যায় অনীক। তার অঙ্কের টিকি রূপদীপের কাছে বাঁধা। ওটা তার ফোর্থ সাবজেক্ট হ’লেও, আরে বাবা, ইঞ্জিনিয়ারি-এর জয়েণ্ট তো দিতে হবে। কে বাঁচাবে সেখানে? অতএব অনুনয় তাকে করতেই হয়, “এই, না দীপ, প্লিজ। এখন দিতে পারব না। সন্ধ্যেবেলায় অঙ্ক করিস তুই। তখন দিয়ে দেব।”
আঠারোর দিকে এগিয়ে চলা তরুণদের সামনে হায়ার-সেকেণ্ডারির রণাঙ্গন তখন। অঙ্ক, রসায়ন, অর্থনীতি, পদার্থবিদ্যা, জীববিজ্ঞান, সাহিত্য প্রভৃতির কঠিন রণসজ্জাকে প্রতিরোধ করতে তাদের কেউ কেউ দিনরাত এক করে ফেলেছে। কারও বা দিন যায় আড্ডাবাজির মস্তিতে, আর রাত কাটে গভীর তপস্যায়। পরিস্থিতি এ’হেন যখন, তাকে সামাল দিয়েও, রোমাঞ্চের সাগরে সাঁতার কাটেন কোন কোন মহাবীর। অমন স-লাঙ্গুল দক্ষতা, অনীক, রূপদীপ, শ্রীজিত কারও নেই। সুতরাং শৌভিককাকুই তাদের একমাত্র ভরসা। মৌলীনারা আপাততঃ মরীচিকা হয়েই থাক।
“মরীচিকা” শব্দটা লেখার পরে দাঁড়ি টেনে দেওয়া যেতেই পারত, কিন্তু এখানেও একটা “কিন্তু” রয়ে গেল। বন্ধুরা হয়ত আর কিছুই টের পেল না। কিন্তু মায়ের চেতনায় ধরা পড়ে অন্য কিছু। ফিজিক্সের অঙ্ক কষতে কষতে রুপু যে তাঁর উদাসীন হয়ে যায়, খাতার পেছনের পাতা জুড়ে তখন আঁকা হতে থাকে অজস্র মুখের ছবি। এমনই একদিন মাকে সামনে বসিয়ে পেনসিল ধরে রূপদীপ। মা বলেন, “পড়াশোনা ফেলে এসব আবার কি করছিস তুই?”
“প্লিজ মা, বেশি নয়। দশ মিনিট বসো।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই পেনসিলের আঁচড়ে ফুটে ওঠে এক মেয়েলি মুখ, “বাহ্, আঁকার কোন নিয়ম না মেনেও দিব্যি এঁকেছিস তো।”
“ভাল বলছ তাহলে?”
“একশবার। ছবিটার মধ্যে একটা আশ্চর্য প্রাণবন্ত ব্যাপার ফুটিয়ে তুলেছিস তুই।”
খাতাপত্র গুটিয়ে নিয়ে নিজের ঘরে পড়তে চলে যায় রূপদীপ। খানিক পরে ওর ঘরে উঁকি দিয়ে মা দেখেন, তখনও ছবিটা নিয়ে ব্যস্ত ছেলে।
“আবার কী করছিস ওই ছবিটা নিয়ে?”
“জানো মা, আরেকজনেরও মিল আছে ছবিটার সঙ্গে।”
“কার? মৌলীনার বুঝি?”
“অদ্ভুত মিল তোমাদের দু’জনের।”
“তাই?”
অনাবিল হাসতে থাকে রূপদীপ। তার সঙ্গে মিশে যায় সলাজুকতার কণা। যা খুশি তাই জানুক না, অনীক, শ্রীজিত, তমাল, অভিজ্ঞান, অভিষেক, কিরণ, বিতান – ওরা সক্কলে। মা কিন্তু জানেন, আসন্ন রণক্ষেত্র ভুলে গিয়ে তাঁর রুপু এখন মাঝেমধ্যেই পেনসিল ধরবে। আর অমনি উড়ে আসবে ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমী। ঠাকুমার ঝুলি খুলে কোন কথা শোনাবে যে তারা রূপকুমারকে কে জানে? মায়ের মন আশঙ্কিত হয়। আবার কিছুটা আনন্দিতও বটে। রূপকথারা তো কোথাও থামতে জানে না। তারা শুধু প্রেক্ষাপট বদলে ফেলে। বদলে ফেলে পাত্রপাত্রীও।
লেখক পরিচিতি : জয়শ্রী পাল
গল্প ও কবিতায় আছি

